বাবা: মেয়েদের আস্থা, ভরসা ও নির্ভরতার জায়গা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
বাবা শব্দটাই নির্ভরতা, সন্তানদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। আর মেয়েদের আস্থা, ভরসা ও নির্ভরতার অনন্য এক জায়গা হলো বাবা। বাবাকে নিয়ে মেয়েদের অনন্য অনুভূতি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে শিক্ষার্থীরা ব্যক্ত করছেন। আর তা তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থী উম্মে সালমা-
বাবা— মহাকাব্য থেকে জীবনের সহজ সমাধান
বাবা যেন এক মহাকাব্য। যে কাব্য যখন-তখন পড়ে ফেলার মতোন যোগ্যতা আমার হুটহাট হয়ে উঠেনি, সেই কাব্য পড়ার জন্য জীবন অংকের সমীকরণের গরমিল হিসাব আর সাথে লেগেছে বয়সের সংখ্যার সমানুপাতিক হার। সময়ের সাথে সাথে বাবাই হয়ে উঠেছেন আমার যাপিত জীবনে মহাকাব্য থেকে বাস্তবতার সহজ সমাধান। আমি বাবা নামক মহাকাব্যকে স্পর্শ করেছি— বাস্তবতার দুয়ারে অসহায়ত্বের দুর্দিনে, চরম বেদনার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে। বাবা নামক অংকের সমাধান পেয়েছি— অপ্রত্যাশিত অসহিষ্ণু যাতনার যাঁতাকলে। পৃথিবীর সমস্ত অসুখ আমাকে গ্রাস করতে চাওয়ার নির্মম দিনে বাবাই কাঁধে হাত রেখে ভরসার মিনার হয়ে দাঁড়িয়ে শান্তির সমাধান। আমার আজকার দুঃখ হচ্ছে চোখের সামনে বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখা, আর নিদারুণ মেনে নেওয়া অসুস্থতার কারণে বাবার দিনকাল, হাসপাতাল থেকে বাড়ি আর বাড়ি থেকে হাসপাতাল। তবুও বাবা দিবসে প্রত্যাশা— ভুলের প্রাচীর ভেঙে যাপিত জীবনের উঠোনে আমাদের সফলতার বাগানে বাবাকে নিয়ে গল্প করতে পারার মতোন সময়। সেই সময়, সেইদিন আসার আগ পর্যন্ত বাবা নামের বটবৃক্ষ ভালো থাকুক, বেঁচে থাকুক।
নুসরাত জাহান জেরিন, শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ।
বাবা: একজন নীরব যোদ্ধা
“প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে,
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”
উপরে লিখিত অংশটি বাংলা মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের বিখ্যাত রচনা অন্নদামঙ্গল থেকে নেওয়া। মানুষ একটা বয়সে পৌঁছনোর পর তার সন্তানের জন্য বাঁচে। সন্তানকে ঘিরেই জীবনের সকল কিছুর পরিকল্পনা করে। কীভাবে তার সন্তান ভালো থাকবে, কিসে মঙ্গল হবে এটাই থাকে একমাত্র ভাবনা। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ হচ্ছেন “বাবা”। যিনি তার পুরোটা জীবন সন্তানদের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গ করেন। কথায় আছে, “মা তার শরীরে সন্তান ধারণ করেন আর বাবারা ধারণ করেন মস্তিষ্কে” নিজের প্রয়োজনগুলো ভুলে গিয়ে সন্তান কিভাবে আরেকটু ভালো থাকবে সেই অন্বেষণ করেন। সন্তানের সুখের আশায় তার সমস্তটুকু দিয়ে দেন অবলীলায়।
সন্তানরে মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে বাবারা অবর্ণনীয় পরিশ্রমও করে থাকেন। কিন্তু বাবাদের ভালোবাসা অপ্রকাশিত এবং আড়ালে থেকে যায়। একদিন বাবারা ক্লান্ত হয়ে যান, বাবাদের বয়স বাড়ে, দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে। সন্তান বড় হলে বাবাদের যেন শেষ সময়টুকু অবহেলায় না কাটে। সব বাবারা ভালো থাকুক। দীর্ঘজীবী হোক।
সুরাইয়া আফরিন হিয়া, শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
বাবা: আমার জীবনের শীতল ছায়া
‘পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই’। হুমায়ুন আহমেদের এই উক্তি থেকেই বোঝা যায় সন্তানের জীবনে বাবার মাহাত্ম্য কতটা গভীর। বাবা মানেই মাথার উপর শীতল, কোমল, স্নিগ্ধ ছায়া। পরিবারের জন্য আজীবন অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমার বাবা। কখনো গাড়িভাড়ার টাকা বাঁচাতে অর্ধেক পথ হেঁটে কর্মস্থলে গেছেন যাতে আমরা স্কুলে গিয়ে উপোষ না থাকি। চাকরিতে ওভারটাইম করেছেন, যেন আমরা টিউশন ক্লাসে যেতে পারি, ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারি। নিজের বেলায় ছেঁড়া জুতো, পুরোনো জামা ব্যবহার করলেও আমাদের কখনো কোনো জিনিসের অভাব অনুভব করতে দেননি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি সবসময় বাবার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছি। বাবার সামর্থ্যের বাইরে এমন কিছু এনে দেওয়ার জন্য জেদ করিনি কারণ আমি তাঁর প্রতিটি পরিশ্রম ও ত্যাগের মূল্য বুঝি। বাবার এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার ঋণ কখনোই শোধ করা সম্ভব নয়।
জোহরা রোজি, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।
অনুপ্রেরণা, শক্তি ও আদর্শের প্রতীক বাবা
সন্তানের অনুপ্রেরণা ও শক্তির অন্যতম উপমা হল বাবা। আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর আড়ালে তারা লুকিয়ে রাখে অগণিত যন্ত্রণা ও একরাশ কষ্টের গল্প যা অগোচরেই থেকে যায়। ছেলে-মেয়ের সাফল্যে তারা যেন নিজের স্বপ্নচূড়া খুঁজে পায়। অথচ বাবারা সন্তানের সুখের দিনেই হারিয়ে যায়।
আমার বাবা আমার দেখা অত্যন্ত সুপুরুষ একজন ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাদের আদব-কায়দা, নৈতিকতা, শিষ্টাচার শিক্ষাদান করেছেন। আমি যখনই কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি তখনই বাবা মনে সাহস দিয়েছেন।তিনি আমার কাছে আদর্শের প্রতীক। পরিবারকে বটবৃক্ষের ন্যায় আগলে রাখা এই মানুষকে আমরা যেন কখনো ভুল না বুঝি। বাবার প্রতি রইল অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তানজিনা আক্তার, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ।
বৃদ্ধ বয়সে বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একসময় বাবা বার্ধক্যে উপনীত হন। যে মানুষটি একদিন সন্তানের হাত ধরে চলতে শিখিয়েছিলেন, বয়সের ভারে তিনিই ধীরে ধীরে সন্তানের সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন। অথচ আজকের নগরজীবনের ব্যস্ততায় সেই বাবাই প্রায়ই হয়ে পড়েন উপেক্ষিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে যায়, দেখা দেয় নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যা। শুধু আর্থিক সহায়তাই যথেষ্ট নয়, পাশে সময় দেওয়া ও মানসিক সাহচর্য প্রদানও সমান জরুরি। মাথার উপরে আকাশ শুধু দেখেছি, কখনো ছুঁতে পারিনি। কিন্তু আমার বাবাকে ছুঁতে পেরেছি— কারণ তিনিই আমার আকাশ। এই অনুভূতি যে সন্তান বুকে ধারণ করেন, তিনি কখনো বাবাকে একা ফেলে যেতে পারেন না।
বাবার বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়, এটি সারাজীবনের ঋণ শোধের সুযোগ। কারণ একজন বাবার প্রতি সন্তানের সর্বোত্তম উপহার হলো— তাঁকে কখনো একা অনুভব করতে না দেওয়া।
সুমনা আক্তার, শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
শুভ্র/