প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরা ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়ছে কেন?

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও মফস্বল অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের মাঝে মেধার কোনো ঘাটতি নেই। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিংবা জাতীয় পর্যায়ের মেধা যাচাইয়ে এর প্রমাণ প্রতিনিয়ত মিলছে। তবে শিক্ষাজীবন শেষ করে পেশাদার ক্যারিয়ারের মূল প্রতিযোগিতায় নামলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। সঠিক সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সময়োপযোগী গাইডলাইনের অভাবে শহুরে তরুণদের তুলনায় মফস্বলের যুবসমাজ ক্যারিয়ারের দৌড়ে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। ভৌগোলিক ও কাঠামোগত এই বৈষম্য কেবল ব্যক্তির ক্যারিয়ারকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং দেশের একটি বিশাল মানবসম্পদকে অনুৎপাদিত রেখে দিচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সার্বিক উন্নয়নে এই সংকটের পেছনের কারণ এবং এর বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
সংকটের নেপথ্যে: কেন তৈরি হচ্ছে এই ক্যারিয়ার বৈষম্য?
ডিজিটাল বাংলাদেশ ও বাস্তবতার দূরত্ব (ডিজিটাল ডিভাইড) কাগজে-কলমে দেশ ডিজিটাল হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এবং ধীরগতি একটি বড় অভিশাপ। ব্রডব্যান্ড লাইনের অভাব এবং মোবাইল ডেটার অতিরিক্ত খরচের কারণে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট জব বা অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এর ওপর একটি ভালো মানের ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কেনার আর্থিক সামর্থ্য অধিকাংশ মফস্বলের পরিবারের থাকে না। শুধু একটি স্মার্টফোন দিয়ে আধুনিক কর্পোরেট ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি নেওয়া অসম্ভব।
সনাতন শিক্ষাব্যবস্থা ও ‘সফট স্কিল’-এর অভাব:
মফস্বলের স্কুল-কলেজ বা স্থানীয় সরকারি কলেজগুলোর পড়াশোনা এখনো অনেকখানি মুখস্থনির্ভর এবং সার্টিফিকেট-কেন্দ্রিক। বর্তমান কর্পোরেট জগতের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ‘সফট স্কিল’ যেমন চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতা (Communication Skill), ইংরেজি ভাষার ওপর দখল, প্রেজেন্টেশন এবং পাবলিক স্পিকিং। গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই দক্ষতাগুলো শেখানোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা দক্ষ ট্রেইনার নেই। ফলে ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে মেধাবী হয়েও অনেকে ছিটকে পড়েন।
তথ্যের শূন্যতা ও মেন্টরশিপের অনুপস্থিতি:
গ্লোবাল বা লোকাল জব মার্কেটে কোন পেশার চাহিদা এখন কেমন, কোন কোন দক্ষতা অর্জন করলে দ্রুত চাকরি পাওয়া যায় সে সম্পর্কে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরা সঠিক সময়ে তথ্য পায় না। তাদের গাইড করার মতো কোনো অভিজ্ঞ পেশাজীবী বা ক্যারিয়ার কাউন্সেলর স্থানীয় পর্যায়ে থাকেন না। ফলে তাদের লক্ষ্য কেবল একটি প্রথাগত সরকারি চাকরি বা সাধারণ কেরানিগিরির বৃত্তেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
সুযোগের চরম কেন্দ্রিকতা ও নেটওয়ার্কিংয়ের অভাব:
দেশের প্রায় সব বড় বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, করপোরেট হাব, স্টার্টআপ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কিংবা প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোতে কেন্দ্রীভূত। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বড় বড় ক্যারিয়ার ফেয়ার, সেমিনার বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিজিটের সুযোগ থেকে মফস্বলের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়। বর্তমান চাকরির বাজারে রেফারেল বা প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং (যেমন: লিঙ্কডইন-এর সঠিক ব্যবহার) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের ক্ষেত্রে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও স্থানান্তরের আর্থিক চ্যালেঞ্জ:
গ্রামীণ পরিবার ও সমাজে এখনো ‘নিরাপদ চাকরি’র (বিশেষ করে সরকারি চাকরি) জন্য এক ধরণের অন্ধ মোহ ও সামাজিক চাপ থাকে। এর বাইরে গিয়ে আইটি সেক্টর, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া বা স্টার্টআপে ক্যারিয়ার গড়ার ঝুঁকি নিতে তারা ভয় পায়। এছাড়া, ক্যারিয়ারের খোঁজে মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন স্ট্রাগল করার মতো আর্থিক ব্যাকআপ সবার থাকে না।
উত্তরণের উপায়: কীভাবে দূর হবে এই ব্যবধান?
জাতীয় উন্নয়নে এই বিশাল বৈষম্য দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন।সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
সুলভ মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট:
প্রতিটি ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে সক্রিয় করে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে হাই-স্পিড ইন্টারনেট ও কম্পিউটার ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
হাই-টেক পার্কের বিকেন্দ্রীকরণ:
বিভাগ ও জেলা শহরগুলোতে আইটি পার্ক বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের মতো কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।
অনলাইন মেন্টরশিপ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন:
দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট লিডারদের উদ্যোগে নিয়মিত অনলাইন কর্মশালা এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেশনের আয়োজন করা যেতে পারে, যা সরাসরি প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরা ঘরে বসেই দেখতে পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা:
মফস্বলে অবস্থিত পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলোতে বাধ্যতামূলক ‘ক্যারিয়ার ক্লাব’ গঠন করতে হবে। ইংরেজি ভাষা ও যোগাযোগের জড়তা কাটানোর জন্য বিশেষ ভাষার কোর্স বা ক্লাব পরিচালনা করা উচিত।
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ক্যারিয়ারের মূল স্রোতধারা থেকে পেছনে ফেলে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। প্রযুক্তির সুষম বণ্টন, সুযোগের বিকেন্দ্রীকরণ এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারলে মফস্বলের এই বিপুল তরুণ সমাজই আগামী দিনের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে।