শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

কথার কোমলতাই ভালো থাকার মূল চাবিকাঠি

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

শব্দের কোনো নিজস্ব ওজন নেই, অথচ মানুষের মনে এর প্রভাব পাহাড়ের চেয়েও ভারী। একটি রূঢ় কথা যেমন মুহূর্তেই সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে, তেমনি একটি মায়াময় কথা শত ক্ষতের প্রলেপ হয়ে মনকে শান্ত করে। যান্ত্রিক এই সময়ে আমাদের শব্দচয়ন ও আচরণের গুরুত্ব নিয়ে নিজেদের গভীর ভাবনাগুলো প্রকাশ করেছেন কয়েকজন তরুণী। তাদের এই চমৎকার ভাবনাগুলোই এক সুতোয় গেঁথেছেন উম্মে সালমা।

কথার কোমলতা ভালো থাকার অনন্য রসদ
নাদিয়া সুলতানা লিজা
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ

মানসিক শান্তি ও সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা বা তৈরি করার অন্যতম শক্তিশালী উপাদান কোমল কথা। কারণ কঠিন কথার আঘাতে একটা মিষ্টি সম্পর্ক নিমিষেই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে, মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। আবার কিছু কোমল শব্দ মুহূর্তেই বহুদিনের ঘুণে ধরা ভঙ্গুর সম্পর্ককে জোড়া লাগিয়ে দেয়। জীবনে ভালো থাকা কেবল শারীরিক সুস্থতার উপর নির্ভর করে না। কোলাহলপূর্ণ এই নশ্বর পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত মানুষের মন বিভিন্ন সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে এবং এই কঠিন ব্যাধি নিয়ে কেউ কেউ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করছে। মানুষের এই কঠিন সময়ে কিছু আস্থার বাণী অন্ধকারে আলোর মতো হয়ে ওঠে। পারস্যের কবি শেখ সাদী তার ‘গুলিস্তা’ গ্রন্থে বলেন, ‘মধুর বাক্য দিয়ে তুমি একটা বুনো হাতিকেও সুতোর বাঁধনে বেঁধে ফেলতে পারো।’ তাই আমাদের উচিত জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় একটু সচেতন হওয়া, নিজেদের বাচনভঙ্গিতে কোমলতা মিশিয়ে অহংকারের সুর, রূঢ়তা ও কর্কশতা ঝেড়ে ফেলা। কথা যেন আঘাত নয়, আস্থা হয়। কারণ কথার স্নিগ্ধতা ও কোমলতাই মানবাত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং তা মানুষের ভালো থাকার আদি রসদ।

শব্দেই আঘাত, শব্দেই প্রশান্তি
নুসরাত জাহান (এ্যানি)
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে গভীর ক্ষত অনেক সময় অস্ত্র নয়, সৃষ্টি করে কিছু তিক্ত শব্দ। আবার একটি সুন্দর বাক্য, একটি কোমল সম্বোধন কিংবা সামান্য আন্তরিক কথাও বদলে দিতে পারে কারও পুরো দিন। পৃথিবীতে সম্পর্ক ভাঙার পেছনে যেমন কঠিন ভাষার ভূমিকা রয়েছে, তেমনি সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে মায়াভরা কথার অদ্ভুত শক্তি। আজকের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতার সময়ে মানুষ ক্রমেই ধৈর্য হারাচ্ছে। ছোট বিষয়েও রাগ, অপমান কিংবা কটু কথার ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। অথচ একটি ভালো কথা মানুষের মনকে শান্ত করে, হতাশ মানুষকে নতুন সাহস দেয় এবং ভেঙে পড়া হৃদয়ে আশার আলো জ্বালায়। কখনো কখনো একজন ক্লান্ত মানুষ শুধু একটি আন্তরিক বাক্যের অপেক্ষায় থাকে, যা তাকে আবারও জীবনের প্রতি বিশ্বাসী করে তোলে। একদিন বাসে ফেরার পথে এক বৃদ্ধাকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে একজন তরুণ শুধু বলেছিল, “আপনি বসুন মা।” ছোট্ট এই সম্বোধনেই বৃদ্ধার মুখে ফুটে উঠেছিল তৃপ্তির হাসি। কারণ মানুষ শুধু সাহায্য নয়, সম্মান ও সুন্দর ব্যবহারও দীর্ঘদিন মনে রাখে। সুন্দর কথা বলার জন্য ধন-সম্পদ লাগে না, লাগে শুধু সুন্দর মন। পরিবার, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্র, সব জায়গাতেই নম্র ও ইতিবাচক ভাষা সৌহার্দ্য তৈরি করে। তাই আঘাত নয়, আমাদের শব্দ হোক ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।

সুন্দর কথা এক ধরনের মহৌষধ
মোছা: ইসরাত জাহান ইবা
শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

সুন্দর বা ইতিবাচক কথা হলো একধরনের মহৌষধ। একটি সুন্দর কথা মানুষের মন জয় করে নিতে পারে, আবার একটি কটু কথা মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, শিশুদের বাড়ন্ত বয়সে যখন তাদের নতুন নতুন বিষয় নিয়ে জানার ও শেখার কৌতূহল থাকে, তখন তারা নানা ধরনের ভুল করে থাকে। সেক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় বয়োজ্যেষ্ঠরা রাগের বশবর্তী হয়ে শারীরিক আঘাত বা কটু কথায় রাগ প্রকাশ করেন। যা শিশুদের শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি করে। ফলে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ আঘাত কেবল শারীরিক হয় না, কথার আঘাতও মানুষের মন এবং আত্মবিশ্বাসে চির ধরাতে পারে। এছাড়াও দেখা যায়, সহপাঠীদের মধ্যে যখন কেউ নিজের সমস্যা প্রকাশ করে, তখন অনেকেই সমাধানের পরিবর্তে তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করে থাকে। ফলে উক্ত ব্যক্তি সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে নতুন মানসিক ক্ষত নিয়ে ফিরে যায়। অথচ অন্যান্য সহপাঠীদের দু-একটি সুন্দর কথাই হতে পারতো তার সারাদিনের স্বস্তি। আমাদের চারপাশে এরকম অনেক ঘটনা আমরা স্বামী-স্ত্রী, শিক্ষক-ছাত্র, সহকর্মী ইত্যাদি বিভিন্ন সম্পর্কে প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। মনে রাখতে হবে, শব্দের চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর কিছু নেই। একটি কটু কথা যেমন যুদ্ধ বাধাতে পারে, তেমনি একটি সুন্দর কথা সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে পারে। সুন্দর কথাতেই সুন্দর ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে।

ভাঙা-গড়ায় কথার ক্ষমতা অধিকতর
রিকমা আক্তার
শিক্ষার্থী, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ।

কথা, দুই অক্ষরের ছোট্ট এই শব্দটার ক্ষমতা অনেক গভীর। একটু সুন্দর কথা যেমন একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, তেমনি রূঢ় কথা কিংবা খারাপ ব্যবহার ক্ষমতা রাখে জীবনকে এলোমেলো করে দেওয়ার। আমরা মানুষ হিসেবে যত শক্ত মানসিকতার হই না কেন, দিনশেষে প্রিয় মানুষটির একটু সুন্দর ব্যবহার, একটু আন্তরিকতা কিংবা সামান্য মমতাই সারাদিনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারে। অনেক সময় একটা সামান্য কোমল বাক্যই হয়ে ওঠে ভরসা, প্রশান্তি কিংবা এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। বন্ধুবান্ধবের আড্ডায়, প্রিয় মানুষগুলোর সাথে সময় কাটানোর সময় অথবা পরিচিত কারোর সাথে হাসিঠাট্টার ছলে হয়তো কখনো এমন কিছু বলে ফেলি যা বিপরীত পাশের মানুষটির বয়ে বেড়ানো ভীষণ কষ্টকর হয়ে যায়। ঠাট্টার ছলে বলা সামান্য একটা বাক্য অতিরিক্ত ভাবনায় ডুবে থাকা মানুষের জীবনে ঠিক কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা আমাদের ধারণারও বাইরে। হাসিমুখের আড়ালে প্রায় প্রতিটি মানুষই কিছু না কিছু সমস্যায় জর্জরিত থাকে। মানসিকভাবে শক্ত থাকা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমরা চাইলেই পারি একটু সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে কারো দিন সুন্দর করে দিতে, হঠাৎ করা ছোট ছোট প্রশংসার মাধ্যমে কারো এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হতে। কারণ কথার ভাঙার ক্ষমতা থাকলেও গড়ার ক্ষমতা কোনো অংশেই কম নয়।

আচরণেই ব্যক্তি এবং শেকড়ের প্রকাশ
সুরাইয়া আফরিন হিয়া
শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ।

সমাজে সুন্দর আচরণ বা ভদ্রতা খুব মূল্যবান একটি বিষয়। খুব কম মানুষ আছেন যারা অন্যের সাথে সম্মান দিয়ে শ্রদ্ধার সাথে হাসিমুখে কথা বলেন। একে অন্যের দোষ খোঁজা, অহংকার, খোঁচা দেওয়া ও গালি দেওয়া বর্তমান সময়ের ট্রেন্ড বলা চলে। আপনার কাছের মানুষের সাথে আপনার আচরণেই প্রকাশ পাবে আপনি মানুষটা কেমন, আপনি কোন পরিবেশ থেকে এসেছেন অথবা আপনার শেকড়ের পরিচয় কী। সকল ধর্মেই ভালো আচরণ বা ভালো চরিত্রকে মূলভিত্তি হিসেবে বলা হয়েছে। নবী করীম (সা.) বলেছেন, “ঈমানদারদের মধ্যে ঈমানের দিক থেকে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” যে অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাকে কষ্ট দেন। হিন্দুধর্মে কর্মফল হলো কর্মের আইন। বিশ্বাস করা হয়, খারাপ কাজ করলে তা নিজের ও পরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শুভ্র/