রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

কিশোরী মেয়ের সুরক্ষায় চাই বন্ধুত্বপূর্ণ অভিভাবকত্ব

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

আমাদের চারপাশের সংবাদপত্রগুলোর পাতায় চোখ রাখলেই ইদানীং বুক কেঁপে ওঠে। কিশোরী মেয়েদের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদে পড়ে ব্ল্যাকমেইলিং, কিংবা পরিবারের সাথে অভিমান করে আত্মহননের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সমাজে এখন নিত্যদিনের চিত্র। বাংলাদেশের শহুরে ও গ্রামীণ উভয় সমাজেই কিশোরী মেয়েদের ঘিরে এক নীরব অস্থিরতা কাজ করছে। আমরা প্রায়ই এর জন্য প্রযুক্তিকে দোষ দিই কিংবা তরুণ প্রজন্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। কিন্তু একজন অভিভাবক হিসেবে আমরা কি কখনো নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছি?

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান কেবল আমাদের বংশধর নয়, তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহা আমানত। পবিত্র কুরআনের সূরা তাহরীমের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।” এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সন্তানের শুধুমাত্র অন্ন, বস্ত্র আর ভালো স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের মানসিক, নৈতিক ও আত্মিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের ওপর ফরজ।

বিশেষ করে কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের ক্ষেত্রে ইসলাম যে মর্যাদা ও সংবেদনশীলতার শিক্ষা দিয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তানকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এমনভাবে পাশাপাশি থাকব।” এই কথা বলে তিনি নিজের দুই আঙুল একত্রিত করে দেখিয়েছিলেন। কন্যা সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা যখন জান্নাতের গ্যারান্টি হয়, তখন সেই সন্তানের কৈশোরের মনস্তত্ত্ব না বোঝা আমাদের চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো, মেয়েরা একটু বড় হলেই মা-বাবার সাথে তাদের এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। কৈশোর বা টিনএজ বয়সটা মূলত আবেগ, কৌতূহল এবং নিজেদের নতুন করে চেনার বয়স। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে মেয়েরা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময়টাতেই তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মা-বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ সাহচর্য। অথচ আমাদের দেশে বেশিরভাগ পরিবারে দেখা যায় উল্টো চিত্র। শাসন, সন্দেহ আর অতিরিক্ত খবরদারি করতে গিয়ে আমরা মেয়েদের আমাদের থেকে দূরে ঠেলে দিই।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের আরেকটি বিখ্যাত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” এই দায়িত্বশীলতার প্রথম শর্ত হলো সন্তানের সাথে নিরাপদ সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করা। রাসূল (সা.) এবং তাঁর আদরের কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর সম্পর্ক আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায় দেখা যায়, ফাতিমা (রা.) যখনই রাসূল (সা.)-এর কাছে আসতেন, আল্লাহর রাসূল উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, কপালে চুমু খেতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন। ভেবে দেখুন তো, আমরা কয়জন বাবা-মা আমাদের কিশোরী মেয়েটিকে এমন সম্মান ও ভালোবাসা দিতে পেরেছি?

যখন একটি মেয়ে নিজের ঘরে ভালোবাসা, সম্মান ও মনোযোগ পায় না, তখনই সে বাইরের জগত বা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে। আজ বাংলাদেশে কিশোরীদের একটা বড় অংশ যে ভুল সম্পর্কের ফাঁদে পা দিচ্ছে বা প্রতারণার শিকার হচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ঘরের ভেতরের এই মানসিক শূন্যতা। আপনার মেয়ে যদি কোনো বিপদে পড়ে বা কোনো ভুল করে ফেলে, সে যেন ভয়ে কথাটি লুকিয়ে না রেখে সবার আগে আপনার কাছেই ছুটে আসে। শাসন করার আগে তাকে শুনতে হবে। সূরা আল-ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।” পরিবারের ক্ষেত্রেও এই একই নীতি প্রযোজ্য। কঠোরতা সন্তানকে কেবল বিচ্ছিন্নই করে, সংশোধন করে না।

তাই বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্যারেন্টিংয়ে তিনটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি:

১. শোনার অভ্যাস তৈরি করা: মেয়ের বন্ধুদের নিয়ে সমালোচনা না করে তার প্রতিদিনের গল্পগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাকে অনুভব করতে দিন যে তার মতামতের মূল্য আপনার কাছে আছে।
২. গোপনীয়তা ও সম্মান রক্ষা: কৈশোরে মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ খুব প্রবল থাকে। অন্যের সামনে তাকে অপমান করা বা অন্যের সন্তানের সাথে তার তুলনা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
৩. জীবনমুখী ধর্মীয় শিক্ষা: ধর্মকে কেবল ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যম না বানিয়ে, তা কীভাবে আমাদের সম্মান ও সুরক্ষা দেয়, সেটি যুক্তির মাধ্যমে বুঝিয়ে বলুন। পর্দা বা শালীনতা যে কোনো শেকল নয়, বরং তার আত্মমর্যাদার ঢাল, তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করুন।

আমাদের মেয়েরা আমাদের ঘরের বরকত। বাইরের ঝড়-ঝঞ্ঝা আর অস্থির সময় থেকে তাদের বাঁচাতে হলে ঘরের পরিবেশকে হতে হবে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমরা যদি আমাদের প্যারেন্টিং বা সন্তান প্রতিপালনের ধরনকে ঢেলে সাজাতে পারি, তবেই আমাদের কিশোরীরা আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও নিরাপদ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। সময় এসেছে শাসনের লাঠিটা নামিয়ে রেখে মেয়ের কাঁধে ভরসার হাতটি রাখার।

শুভ্র/