শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

সবরের সৌন্দর্য ও মনের প্রশান্তি

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

বর্তমান সময়ে আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছি। আমাদের হাতে এখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আর জীবনের নানা স্বাচ্ছন্দ্য। অথচ আমরা যদি নিজেদের দিকে তাকাই, দেখতে পাব আমাদের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। সম্পদের প্রাচুর্য বা জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও মানসিক প্রশান্তি যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে। জাতীয় দৈনিকের একজন পাঠক হিসেবে আপনি হয়তো সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবছেন, এই অস্থিরতা থেকে মুক্তির উপায় কী। ইসলাম আমাদের এই অতি পরিচিত সমস্যার খুব সহজ ও কার্যকর সমাধান দিয়েছে।

কোরআন ও হাদিসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, ইসলাম শুধু পরকালের কথাই বলে না, বরং এই পৃথিবীতে কীভাবে সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবন কাটানো যায় তার সুস্পষ্ট রূপরেখা দেয়। মানসিক শান্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক। আমরা যখন নিজেদের শেকড় থেকে দূরে সরে যাই, তখনই আমাদের ভেতরে শূন্যতা তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আর-রাদ এর ২৮ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, “জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির বা স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” জিকির মানে শুধু তাসবিহ পড়া নয়, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর ওপর ভরসা করা।

আমাদের অস্থিরতার একটি বড় কারণ হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং অতীত নিয়ে হতাশা। আমরা এমন অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই যা আসলে আমাদের হাতে নেই। ইসলাম আমাদের ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার শিক্ষা দেয়। আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবেন। যখন আমরা বিশ্বাস করি যে একজন সর্বশক্তিমান সত্তা আমাদের কল্যাণ চান, তখন মনের ওপর থেকে বিশাল এক পাথর নেমে যায়। সূরা আল-বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” এই ধৈর্য আমাদের মানসিক শক্তি জোগায়।

হতাশা দূর করার আরেকটি বড় উপায় হলো কৃতজ্ঞতা। আমরা সারাদিন কী পেলাম না তা নিয়ে আফসোস করি। কিন্তু আমাদের যা কিছু আছে তার জন্য যদি আমরা শুকরিয়া আদায় করি, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। সূরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেব।” এই বাড়িয়ে দেওয়া শুধু সম্পদ নয়, বরং মনের সুখ ও প্রশান্তিও। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন দুনিয়াবি বিষয়ে সবসময় নিজের চেয়ে নিচের দিকের মানুষের দিকে তাকাতে। এতে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের কদর বোঝা যায় এবং মনে তৃপ্তি আসে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, “মুমিনের বিষয়টি কতই না আশ্চর্যের! তার সব কাজেই কল্যাণ রয়েছে। সে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করলে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সবর করে, ফলে এটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)

মানসিক প্রশান্তির আরেকটি দিক হলো মানুষের সাথে আমাদের আচরণ। আমরা অনেক সময় অন্যের প্রতি ক্ষোভ, হিংসা বা অহংকার পুষে রাখি। এগুলো আমাদের মনের ভেতরে বিষের মতো কাজ করে। রাসূল (সা.) পারস্পরিক সালাম ও ভালোবাসা বিনিময়ের ওপর জোর দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের ৫৪ নম্বর হাদিসে এসেছে, “তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর পারস্পরিক ভালোবাসা না থাকলে তোমাদের ঈমান পূর্ণ হবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।” অন্যকে ক্ষমা করে দিলে যে অদ্ভুত এক হালকা অনুভূতি হয়, তা যেকোনো চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর।

আমাদের জীবন কখনো সমতল রাস্তার মতো হবে না। এখানে ওঠানামা থাকবেই। কিন্তু আমরা যদি কোরআন ও সুন্নাহর এই মৌলিক শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারি, তবে বাইরের পরিবেশ যতই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হোক না কেন, আমাদের ভেতরের পৃথিবী থাকবে শান্ত ও নিরাপদ। আসুন, আমরা আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে কিছুটা সময় বের করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ি এবং তাঁর কাছে আমাদের মনের সব কথা বলি। দেখবেন, জীবনের চেনা পথেই আপনি এক নতুন প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন।

ডিএ/