অন্যের দোষ খোঁজার ব্যাধি ও তার প্রতিকার

আজ পবিত্র জুমার দিন। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ এই দিনে মসজিদে গিয়ে আমরা যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াই, তখন মূল শিক্ষা থাকে ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও আত্মশুদ্ধি। অথচ বাস্তব জীবনে আমরা অনেকেই এমন এক নীরব ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা ধীরে ধীরে আমাদের অন্তরকে কলুষিত করে ফেলে। সেই ব্যাধিটি হলো অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযাচিত নাক গলানো বা অন্যের পিছু লাগা।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন সে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধনের চেয়ে অন্যের ছিদ্রান্বেষণে বেশি সময় ব্যয় করে। কারো ব্যক্তিগত জীবনে কী ঘটছে, সে কী খেল, কোথায় গেল, কী ভুল করল তা খুঁজে বের করা যেন এক শ্রেণির মানুষের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইসলাম মানুষের এই বদভ্যাসকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে।
কুরআনের দ্ব্যর্থহীন নিষেধাজ্ঞা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার এবং অযথা গোয়েন্দাগিরি না করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আল-হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
“হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পেছনে গিবত করো না।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
এই আয়াতের নির্দেশ অত্যন্ত পরিষ্কার। কারো ব্যক্তিগত বিষয় অযথা খুঁজে বের করা কোনো সৎ মানুষের কাজ হতে পারে না। অন্যের দোষ খোঁজা এমন এক আগুন, যা প্রথমে নিজের নেক আমলগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
নবীজির সতর্কবার্তা
অন্যের পিছু লেগে তার সম্মানহানি করার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ধরনের মানসিকতার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
হযরত আবু বারযাহ আল-আসলামী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“হে ঐ সকল লোক, যারা কেবল মুখে ঈমান এনেছ কিন্তু অন্তরে এখনো ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করো না এবং তাদের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করো না। কারণ যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার ত্রুটি প্রকাশ করে দেবেন। আর আল্লাহ যার ত্রুটি প্রকাশ করবেন, তাকে তার ঘরের ভেতরেও অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবেন।” (সুনান আবু দাউদ: ৪৮৮০, সুনান তিরমিযী: ২০৩২)
নিজের ঘরের ভেতরেও লাঞ্ছিত হওয়ার এই ঘোষণা যে কারো অন্তরে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আপনি যখন অন্যের সম্মান নষ্ট করতে চাইবেন, তখন আল্লাহ আপনার সম্মান এমন জায়গা থেকে কেড়ে নেবেন যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।
উত্তম চরিত্রের পরিচয়
একজন প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় কী? ইসলাম বলে, অনর্থক বিষয় বর্জন করাই একজন মানুষের সুন্দর চরিত্র ও দৃঢ় ঈমানের প্রমাণ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, যা তার কোনো উপকারে আসে না তা বর্জন করা।” (সুনান তিরমিযী: ২৩১৭)
অন্যের পেছনে সময় নষ্ট করে দুনিয়া বা আখিরাতের কোনো লাভ নেই। বরং এর ফলে অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ জন্ম নেয়। অন্যকে নামাতে গিয়ে নিজের আত্মিক পতন ঘটে।
কীভাবে মুক্ত হবেন এই ব্যাধি থেকে?
নিজের আমলের হিসাব নেওয়া: অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকান। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি?
জিহ্বা ও চোখ সংযত রাখা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বাস্তব জীবনে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন।
অন্যের জন্য দুআ করা: কারো কোনো ত্রুটি নজরে এলে তা ছড়িয়ে না দিয়ে গোপনে তার হেদায়াত ও সংশোধনের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।
আসুন, পবিত্র এই জুমার দিনে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, অন্যের পিছু ছোটা বন্ধ করে নিজের ঈমান, চরিত্র ও পরিবার গঠনে মনোযোগী হব। অন্যকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া এবং নিজের অন্তরে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মারাত্মক মানসিক ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
ডিএ/