শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

যান্ত্রিক জীবনে জুমার দিন: আত্মার খোরাক ও মহামিলনের বার্তা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

সপ্তাহের প্রতিটি দিনই মহান আল্লাহর নিয়ামত, তবে শুক্রবার অর্থাৎ জুমার দিনের মর্যাদা একেবারেই আলাদা। জাগতিক ব্যস্ততা আর যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তির মাঝে এই দিনটি আসে আত্মার প্রশান্তি আর আত্মশুদ্ধির সুযোগ নিয়ে। মুমিনের কাছে জুমার দিন নিছক ছুটির দিন নয়, বরং এটি এক মহামিলন ও ঈমান নবায়নের মোক্ষম সময়। ইসলামি শরিয়তে জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন বা ‘সাইয়্যিদুল আইয়াম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দিনের মাহাত্ম্য তুলে ধরে বলেছেন, “সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর জুমার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)। এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয় যে মানব ইতিহাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু অধ্যায় এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জুমার সালাতের গুরুত্ব দিয়ে একটি স্বতন্ত্র সুরা নাজিল করেছেন। সুরা আল-জুমুআহর ৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “হে মুমিনগণ, যখন জুমার দিন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং কেনাবেচা বন্ধ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।” আল্লাহর এই নির্দেশনার পেছনে গভীর এক সামাজিক ও আত্মিক দর্শন রয়েছে। মানুষ যেন পার্থিব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সপ্তাহে অন্তত একবার একত্র হয়ে এক স্রষ্টার সামনে মাথা নত করতে পারে, সেই আহ্বানই এখানে জানানো হয়েছে। এরপর সালাত শেষ হলে আবার পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে বলা হয়েছে, যা ইবাদত ও কর্মের এক সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করে।

জুমার দিনের বরকত পুরোপুরি অর্জন করতে হলে কিছু সাধারণ সুন্নতের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। এই দিনে গোসল করা, পরিষ্কার বা সাদা পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং মিসওয়াক করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার নামাজে আগেভাগে উপস্থিত হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যারা জুমার নামাজে আগে উপস্থিত হয়, তাদের জন্য ক্রমানুসারে উট, গরু কিংবা ছাগল কুরবানি করার সমান সওয়াব নির্ধারিত থাকে। মসজিদে পৌঁছে নিশ্চুপ হয়ে খুতবা শোনা জরুরি। খুতবা চলাকালীন মোবাইল ব্যবহার করা বা পাশের কারও সাথে ফিসফিস করে কথা বলাও খুতবার ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করে এবং জুমার সওয়াব থেকে বঞ্চিত করে।

এই বিশেষ দিনের আরও দুটি বড় আমল রয়েছে। প্রথমটি হলো সুরা আল-কাহফ তিলাওয়াত করা। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূর বা আলো দ্বারা উদ্ভাসিত থাকবে (মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস: ৩৩৯২)। দ্বিতীয়টি হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। তিনি নিজে জুমার দিনে তাঁর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ এই দরুদ তাঁর কাছে সরাসরি পেশ করা হয়।

জুমার দিনের আরেকটি বিশাল উপহার হলো দোয়া কবুলের এক গোপন মুহূর্ত। সহিহ বুখারির ৯৩৫ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম বান্দা সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণ কামনা করলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন না। উলামায়ে কেরামের মতে, এই সময়টি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে আসরের পর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে।

তাই আসুন, জুমার দিনকে কেবল আড্ডা আর বিশ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর রুহানি গুরুত্ব অনুধাবন করি। অন্তরের কালিমা ধুয়ে ফেলে নতুন করে নিজেকে গড়ার প্রতিজ্ঞা করি। এই দিনে আল্লাহর কাছে নিজের পাপের ক্ষমা চাই এবং পরিবার, সমাজ ও গোটা উম্মাহর শান্তির জন্য বিনম্র চিত্তে দোয়া করি।