মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

বিভাজন ভুলে ফিরে যাই নবীর আদর্শে

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

রবিউল আউয়াল—আমাদের কাছে নিছক একটি মাস নয়। এটি ভালোবাসার মাস, আনন্দের মাস, স্মরণের মাস। কারণ এই মাসেই পৃথিবীর বুকে আগমন ঘটেছিল সেই মহামানবের—যাঁর আগমনে মানবতার অন্ধকার দূর হয়ে আলোর পথ উন্মোচিত হয়েছিল। যিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত হয়ে এসেছিলেন—আমাদের প্রিয় নবী, হাবীবুল্লাহ, আহমদে মুজতবা,দরুদে মোস্তফা, শাফায়াতের কান্ডারী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মায়ার নবী  মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ।

আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”
—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭

যাঁর আগমন আমাদের জন্য রহমত, যাঁর জীবন আমাদের জন্য আদর্শ, যাঁর প্রতি ভালোবাসা আমাদের ঈমানের সৌন্দর্য—তাঁরই উম্মত আমরা।

কিন্তু আফসোস!
রবিউল আউয়াল আমাদের মাঝে আসে, নবীপ্রেমের আবেগ জাগায়—আর আমরা সেই নবীর উম্মত হয়েও কখনো কখনো একে অপরের বিরুদ্ধে বিভাজনের দেয়াল তুলে দিই।

তখন হৃদয়ের ভেতর থেকে একটি প্রশ্ন জেগে ওঠে—

কেন আমরা এক হতে পারি না?
আমরা তো একই আল্লাহর বান্দা।
একই কুরআন আমাদের কিতাব।
একই কাবা আমাদের কিবলা।
একই নবী আমাদের নবী।
একই রাসূলের উম্মত আমরা।

তাহলে এত বিভাজন কেন?
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের পরিচয় দিয়েছেন মুসলিম হিসেবে। অথচ আমরা কখনো নিজেদের বিভিন্ন পরিচয়ে এমনভাবে বিভক্ত করি যে, এক সময় মনে হয়—আমরা যেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী!

অথচ আল্লাহ তাআলা আমাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩

এই একটি আয়াত কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?

আমাদের আমলে পার্থক্য থাকতে পারে, ফিকহি বিষয়ে ইখতিলাফ থাকতে পারে, ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন আমাদের ভ্রাতৃত্বকে ধ্বংস না করে।

কারণ— মতপার্থক্য থাকতে পারে, হৃদয়ের দূরত্ব কেন থাকবে? ইখতিলাফ থাকতে পারে, বিদ্বেষ কেন থাকবে?
আলোচনা থাকতে পারে, অপমান কেন থাকবে?

আমারা তো এক নবীর উম্মত! তাহলে আমাদের মৌলিক বন্ধনে অন্তত এক হওয়া দরকার নয় কি?

আমরা সবাই হককে মানতে চাই। আমরা সবাই হিদায়াত চাই। আমরা সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই। তাহলে আমার কোথায় ভুল—সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি না কেন?

আমার ভুল থাকলে আমাকে অপমান করবেন না। আমাকে সঠিকটা বোঝার সুযোগ দিন। আর আপনার ভুল থাকলে আপনিও যেন সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর সত্যকে গ্রহণ করার সাহস রাখেন।

কারণ— সত্য আমার নয়, সত্য আল্লাহর।

আমি যদি ভুল হই, আমার মতও ভুল হতে পারে।
আপনি যদি ভুল হন, আপনার মতও ভুল হতে পারে।
কিন্তু সত্য যখন স্পষ্ট হয়ে যাবে, তখন অহংকার নয়—সত্যের কাছে আত্মসমর্পণই হওয়া উচিত মুমিনের পরিচয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
“মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১০

ভেবে দেখুন—
যাঁরা একই রবের বান্দা, তাঁদের মধ্যে এত অহংকার কিসের? যাঁরা একই নবীর উম্মত, তাঁদের মধ্যে এত বিদ্বেষ কিসের? যাঁরা একই কিবলার দিকে সিজদা করেন, তাঁদের মধ্যে এত দূরত্ব কিসের?

আমরা কেন একজন আরেকজনকে সুন্নী ও ওহাবি ট্যাগ দিয়ে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি?

কেন আগে মানুষটাকে বিচার করি না, তার কথা বুঝতে চেষ্টা করি না? কেন বিভ্রান্তি দূর করার পরিবর্তে বিভাজন বাড়াই? কেন সত্যের সন্ধান না করে শুধু নিজের মতের বিজয় চাই?

যদি আমি সত্যের পক্ষে থাকি, তবে আমার ভাইকে সত্যের সন্ধান দেওয়াই তো আমার ভালোবাসা হওয়া উচিত—তাকে অপমান করা নয়।

মিলাদুন্নবী ও সীরাতুন্নবী—বিভাজনের বিষয় কেন?

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান ও উপলব্ধিতে, মিলাদুন্নবী ﷺ এবং সীরাতুন্নবী ﷺ—এ দুটিকে আমাদের পারস্পরিক বিভাজনের মাপকাঠি বানানোর কোনো প্রয়োজন দেখি না।

অথচ আমার কিছু দ্বীনি ভাইকে দেখি—যাঁরা মিলাদুন্নবী ﷺ স্মরণ করেন, তাঁরা কখনো সীরাতের গুরুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। আবার যাঁরা সীরাতুন্নবী ﷺ নিয়ে আলোচনা করেন, তাঁদের কেউ কেউ মিলাদুন্নবী ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশকে গ্রহণ করেন না।

এই দূরত্বটা কেন?
আমার কাছে তো দুটিই দরকার।

কারণ— মিলাদ আমাদের নবীপ্রেমের অনুভূতি জাগায়, আর সীরাত সেই ভালোবাসাকে জীবনের আদর্শে রূপ দিতে শেখায়।

মিলাদে আমরা স্মরণ করি—
কী মহামূল্যবান নেয়ামত হিসেবে আল্লাহ আমাদের মাঝে তাঁর হাবীব ﷺ-কে পাঠিয়েছেন।

আর সীরাতে আমরা শিখি—
সেই হাবীব ﷺ কীভাবে জীবন কাটিয়েছেন এবং আমরা কীভাবে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করব।

যাঁকে ভালোবাসি, তাঁর জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করে আনন্দিত হওয়ার অনুভূতি হৃদয়ে থাকা অস্বাভাবিক কীভাবে?

আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا
“বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে—এতেই তারা আনন্দিত হোক।”
—সূরা ইউনুস, ১০:৫৮

আর রাসূলুল্লাহ ﷺ তো আল্লাহর পক্ষ থেকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তাই নবীপ্রেমের আনন্দ হৃদয়ে থাকা—এটি আমার কাছে ভালোবাসার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।

তবে সেই ভালোবাসা যেন শরিয়তের সীমা অতিক্রম না করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা ও আদবের বাইরে না যায়—এটিও আমাদের মনে রাখতে হবে।

কারণ নবীপ্রেম শুধু মুখের স্লোগান নয়। নবীপ্রেম হলো হৃদয়ের অনুভূতি, দরুদের সুর, চোখের অশ্রু, চরিত্রের সৌন্দর্য এবং জীবনে সুন্নাহর বাস্তব প্রতিফলন।

আর এখানেই আসে সীরাতুন্নবী ﷺ।
আল্লাহ বলেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১

তাহলে আমরা কেন একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে দূরে ঠেলে দেব?
মিলাদে থাকুক নবীপ্রেম, সীরাতে থাকুক নবীর জীবন,সুন্নাহ্য় থাকুক নবীর অনুসরণ,আর আমাদের চরিত্রে ফুটে উঠুক নবীজির আদর্শ।

এটাই তো হওয়া উচিত আমাদের পথ। কারণ মিলাদ যদি হৃদয়ে নবীপ্রেম জাগায়, সীরাত সেই ভালোবাসাকে জীবনের পথে পরিচালিত করে।

একটিকে অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী বানানোর পরিবর্তে আমরা কি দুটোকেই নবীপ্রেমের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ হিসেবে দেখতে পারি না?

আমাদের ফিরে যেতে হবে নবী ﷺ-এর উম্মাহর পরিচয়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে—আমরা একে অপরের শত্রু নই। আমরা একই উম্মাহর সন্তান। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মত হয়ে যদি আমরা পরস্পরের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব ভুলে যাই, তাহলে আমাদের নবীপ্রেমের দাবিটি কতটা পূর্ণ হলো—সেটিও নিজেদের কাছে প্রশ্ন করা দরকার।

নবী ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন ভালোবাসা, দয়া, ক্ষমা, ভ্রাতৃত্ব ও উত্তম চরিত্র। তাই আমাদের দ্বীনি আলোচনা এমন হওয়া উচিত—
যেখানে জ্ঞান থাকবে, কিন্তু অহংকার থাকবে না।
দলিল থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না।
সংশোধন থাকবে, কিন্তু অপমান থাকবে না।
মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু ভ্রাতৃত্ব হারাবে না।

আমরা কাউকে ভুল মনে করলে তাকে সত্য বোঝানোর চেষ্টা করব।কিন্তু তাকে ঘৃণা করার আগে একবার ভাবব।সে-ও তো আমার মতোই এক কালেমার মানুষ। সে-ও তো আমার মতোই একই রবের কাছে সিজদা করে। সে-ও তো আমার মতোই সেই নবী ﷺ-এর উম্মত।

হয়তো আমার মধ্যে ভুল আছে।
হয়তো তার মধ্যেও ভুল আছে।

কিন্তু আমরা দুজনেই যদি সত্যের সন্ধানী হই, তাহলে আমাদের মধ্যে এত শত্রুতা কেন?

হে আল্লাহ!
আপনার এই গুনাহগার বান্দার অন্তরের ফরিয়াদ কবুল করুন।

হে রব!
আমাদের ভুল বোঝাবুঝিগুলো দূর করে দিন। আমাদের হৃদয়ের বিভেদ দূর করে দিন। আমাদের অহংকার দূর করে দিন।

ধর্মীয় গোঁড়ামি, হিংসা, বিদ্বেষ ও পরস্পরকে হেয় করার মানসিকতা থেকে আমাদের হেফাজত করুন।
আমাদের এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে, এক কিবলার অনুসারী হিসেবে এবং আপনার প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত হিসেবে কবুল করুন।

হে আল্লাহ,
আমাদের মধ্যে এমন ঐক্য সৃষ্টি করুন—যে ঐক্য সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, ভালোবাসায় পূর্ণ এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য।

আমাদের ভুল থাকলে ভুল স্বীকার করার সাহস দিন। সত্য বুঝলে সত্য গ্রহণ করার তাওফিক দিন। নিজের মতের অহংকার থেকে মুক্ত রাখুন। অন্যের ভালো গ্রহণ করার উদারতা দিন।

হে আল্লাহ,
যাঁরা আপনার দ্বীনের জন্য কাজ করছেন—তাঁদের অন্তরকে পরস্পরের জন্য নরম করে দিন। উম্মাহর বিভেদ দূর করুন। আমাদের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্মান ফিরিয়ে দিন। মতানৈক্যের অন্ধকার পেরিয়ে আমাদের সত্যের আলোয় একত্রিত করুন।

হে রব,
আমাদের হৃদয়ে আপনার হাবীব ﷺ-এর ভালোবাসা এমনভাবে স্থাপন করুন—যেন সেই ভালোবাসা শুধু রবিউল আউয়ালের আবেগে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং আমাদের নামাজে, চরিত্রে, আচরণে, পরিবারে, সমাজে এবং প্রতিটি জীবনের সিদ্ধান্তে তাঁর সুন্নাহর সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

আমাদের মিলাদে নবীপ্রেম দিন,
সীরাতে নবীর শিক্ষা দিন,
সুন্নাহয় নবীর অনুসরণ দিন,
আর অন্তরে নবী ﷺ-এর সত্যিকারের মহব্বত দিন।

হে আল্লাহ,
আমরা জানি—আমরা গুনাহগার। আমরা দুর্বল। আমরা ভুল করি। কিন্তু আমরা এটাও জানি— আপনি ক্ষমাশীল।
আপনি দয়ালু। আপনি বান্দার তাওবা কবুল করেন।
তাই আমাদের ফিরিয়ে নিন আপনার রহমতের ছায়ায়। আর আমাদের এমন উম্মত বানিয়ে দিন— যারা বিভাজনের দেয়াল নয়, ভালোবাসার সেতু নির্মাণ করবে। যারা মানুষকে দূরে ঠেলে দেবে না, সত্যের পথে কাছে টানবে। যারা মতের অহংকারে নয়, হকের আনুগত্যে বড় হবে। যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে শুধু ভালোবাসার দাবি করবে না—তাঁর আদর্শকে নিজেদের জীবনে ধারণ করবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত— আমরা সবাই একই রবের বান্দা,
একই নবীর উম্মত। তাই আবারও হৃদয়ের গভীর থেকে প্রশ্ন করি—

“কেন আমরা এক হতে পারি না?”
হয়তো উত্তরটা অন্যের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
উত্তরটা শুরু করতে হবে আমার নিজের হৃদয় থেকেই।

اللهم ألّف بين قلوبنا وأصلح ذات بيننا

হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়গুলোকে পরস্পরের জন্য এক করে দিন এবং আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো সংশোধন করে দিন।
আমীন, ইয়া রব্বুল আলামীন।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।