বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

কোরবানি যেন শুধু ‘ঈদুল আযহা’য় সীমাবদ্ধ না হয়

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

যরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতি বহন করে মুসলিম উম্মাহর মাঝে আবারও ফিরে আসছে পবিত্র ঈদুল আযহা। ইসলামের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম এই ঈদুল আযহা। এই বিশেষ দিনে আল্লাহ তাআলা সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ ইবাদত আবশ্যক করেছেন, আর তা হলো—‘কুরবানি’। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়তসম্মত উপায়ে পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়।

ইসলামে কুরবানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রথা এবং ইবাদাত। জাহেলি যুগে কাফের ও মুশরিকরা তাদের দেব-দেবী, মূর্তির বেদি কিংবা বিভিন্ন কবরে পূজা দিত এবং তাদের উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গ করত। সেই শিরকি প্রথার প্রতিবাদস্বরূপ মুসলমানদের কেবল এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় ও কুরবানি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।” (সূরা কাওসার, আয়াত: ২)

কুরবানির গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছাকাছিও না আসে।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩)। একজন মুমিনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই একটি বাণীই কুরবানির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট। আসলে আমাদের জীবন, মরণ ও সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত; আর কুরবানি হলো সেই সামগ্রিক নিবেদনেরই একটি প্রতীকী রূপ।
কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মূলত বান্দার অন্তরের তাকওয়া ও ত্যাগের পরীক্ষা নেন। এটি আমাদের ইসলামের আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই চরম আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক পরীক্ষাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

তবে এই কুরবানি বা আত্মত্যাগের চেতনা কেবল ঈদুল আযহার নির্দিষ্ট দিনটিতেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় সারা বছরই নিজের প্রিয় সম্পদ ও স্বার্থ অন্য মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আমাদের সমাজের গরিব, অভাবী ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় নিজের অর্থলোভ ও স্বার্থপরতা ত্যাগ করাটাও এক ধরনের কুরবানি।

এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় হাদিসে কুদসির মাধ্যমে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, “আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার দাওনি। আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি। আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমার সেবা করোনি।” বান্দা তখন বিস্মিত হয়ে বলবে, “হে আমার প্রতিপালক! তুমি তো সমস্ত জগতের প্রতিপালক, অভাবমুক্ত। তুমি তো আহার বা পান করো না; তুমি কীভাবে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত বা অসুস্থ হতে পারো?” আল্লাহ তাআলা তখন উত্তর দেবেন, “আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছিল, তুমি তাকে খাবার দাওনি। তাকে খাবার দিলে আজ তা আমার কাছে পেতে। আমার অমুক বান্দা তৃষ্ণার্ত ছিল, তাকে পানি দাওনি। তাকে পানি দিলে তা আজ আমার কাছে পেতে। আমার অমুক বান্দা রোগে ভুগছিল, তুমি তার সেবা করোনি। তার সেবা করলে সেখানে আমাকে পেতে, তুমি কি তা জানতে না?” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৯)

ঈদুল আযহার মতো সারা বছরই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগের মানসিকতা ধরে রাখাই কুরবানির আসল লক্ষ্য। আমাদের ভেতর যদি এই স্থায়ী ত্যাগের মনোভাব গড়ে ওঠে, তবেই বুঝতে হবে কুরবানি সার্থক হয়েছে। অন্যথায়, এটি কেবলই একটি নামমাত্র লৌকিকতা ও ভোগবাদী অনুষ্ঠানে রূপ নেবে।

পশুর গলার ওপর ছুরি চালানোর পাশাপাশি আমাদের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার ও স্বার্থপরতাকেও কোরবানি দিতে হবে। আমাদের এই আত্মত্যাগ যেন শুধু এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে সারা বছরের জীবনদর্শনে পরিণত হয়—পবিত্র ঈদুল আযহায় এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী