প্যারাডাইম শিফট: অন্ধ বাজেট বাস্তবায়নের অবসান ও নাগরিক অধিকার

কাজী মো. ইসমাঈল হোসেন:
আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নাগরিক সুবিধাকে উদ্দেশ্য করে কাজ করার সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। তাই প্রান্তিক জনগণ শুধু কলাপাতায় চিঠি লিখে রাখে যেখানে লেখা থাকে কানা বগির ছা। তাদের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাওয়া হলে চাওয়ার কোনো অন্ত থাকে না কিন্তু দিনশেষে তারা পায় শুধু কানা বগির ঠ্যাং। তারা বাতাসের বিপরীতে পলক ফেললে দেখে ঘোলা কাচ। অন্যদিকে তাকালে দেখে খাল আর খালে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে ব্যাঙ। আবার আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে আড়চোখে দেখে চারদিকে কে যেন ঘুরঘুর করছে আর বলছে কাঁচা বয়সে এত ভাবতে নেই আশাবাদী থাকো বাকিটা পেয়ে যাবে আপাতত সরে দাঁড়াও। প্রান্তিক পর্যায়ে এই বঞ্চনার কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস বা প্রায়োগিক উপযোগিতা মূল্যায়ন দৃশ্যমান হয় না। ব্যয়ের ভাউচার থাকে কিন্তু নাগরিক সন্তুষ্টি থাকে না বরং থাকে শুধু বঞ্চনাবোধ।
আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো বরাবরই একপেশে ও পরিসংখ্যানগত বৈপরীত্যে ভরপুর। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রিসার্চ পেপারগুলোতে বারবার এই নির্মম সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও অনুন্নয়ন খাতের জটিল হিসাব জাতীয় বাজেটের প্রকাণ্ড কলামে উদ্ভাসিত হয়। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির কৃত্রিম পরিসংখ্যানের শূন্যতা থেকেই যায়। এই পাহাড়সম রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিপরীতে প্রান্তিক মানুষের দৈনিক জীবনে সুফলের অদৃশ্য সূচকের সঠিক হিসাব কোথায় মিলবে বা এই অদৃশ্য মেকানিজমটি ঠিক কোন গহ্বরে লুক্কায়িত রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাস্তবতা হলো উন্নয়ন ও অগ্রগতি আজ কেবল দৃশ্যমান বিশালাকার কাঠামোতে বন্দি। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার পাবলিক এক্সপেন্ডিচার রিভিউয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে অনেক সময় ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও বা মূলধন উৎপাদন অনুপাত অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পায়। এটি মূলত পুঁজির চরম অপচয় এবং বিনিয়োগকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। আমাদের কাঠামোগত পরিকল্পনায় বিশালাকৃতির চেইনে সাধারণ নাগরিকরা কতটুকু উপকৃত হয় সে সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল নই।
বেশ কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সৈয়দপুর রংপুর মহাসড়কের সংস্কারকাজ তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়। ফলশ্রুতিতে সংস্কারের দুদিন পর রাস্তার অবস্থা ঢের বেগতিক হয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রশাসনিক কাঠামোর গোড়ায় গলদ রয়েছে। অর্থনীতির তাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় রেন্ট সিকিং প্রবণতা এবং কাঠামোগত অদক্ষতার ফাঁদ। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল প্রবণতা হলো দৃশ্যমান আউটপুট বা ফলাফল নিশ্চিত করার চেয়ে ইনপুট বা অর্থ ছাড় করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি বাজেট বাস্তবায়ন করল কিংবা অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে হুজুগে তাড়নায় তড়িঘড়ি করে কত শতাংশ অর্থ খরচ করে নজির গড়ল মূল্যায়ন হয় কেবল তার ওপর। অথচ বিভিন্ন সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট স্টাডি বা সামাজিক প্রভাব গবেষণায় এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে সঠিক তদারকি মাঠপর্যায়ের কঠোর ফলোআপ ও সুফলের সুনির্দিষ্ট রূপরেখার অভাবে ব্যয়ের একটি বিরাট অংশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘমেয়াদে সোশ্যাল রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বা সামাজিক বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল তলানিতে গিয়ে ঠেকে। পরিণামে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তথাকথিত মেগা অবকাঠামো অনেক সময় জনকল্যাণের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি জনদুর্ভোগে পরিণত হয়।
একটি জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সুদৃঢ় করতে হলে রিগোরাস ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা কঠোর প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। উন্নয়ন পরিসংখ্যানের অলীক মায়াজালে যখন খেটে খাওয়া মানুষ সুবিধাবঞ্চিত হয় তখন সেই উন্নয়ন জনকল্যাণমুখী না হয়ে কেবল নীতিনির্ধারকদের আত্মতুষ্টির কৃত্রিম হাতিয়ারে পরিণত হয়। এ জন্য টাইম কিলিং প্রসিডিউরে না গিয়ে সুদূরপ্রসারী প্যারাডাইম শিফট প্রয়োজন। বাজেট বাস্তবায়নের অন্ধ হার দিয়ে রাষ্ট্রীয় সাফল্যের পরিমাপ করা বন্ধ করতে হবে। এর পরিবর্তে সুফলের সুনির্দিষ্ট গুণগত ও স্বচ্ছ হিসাব নেওয়ার এক অপ্রতিরোধ্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ জনগণের ঘামে ও রক্তে অর্জিত রাজস্বের শেষ কানাকড়িটিরও প্রকৃত জবাবদিহি থাকতে হবে মানব উন্নয়ন ও জীবনমানের গভীর রূপান্তরের নিখুঁত পরিমাপে। এই হিসাব শুধু সরকারি কোষাগারের ধুলোবালিমাখা খাতায় বা অডিটের লাল ফিতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
শিক্ষার্থী, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।