পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদ: সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন

মো. জাহিদ হাসান:
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সর্বভৌমত্বের একটি অংশ। কিন্তু, সেখানকার ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং বসবাসকারী মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণে বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল আগে থেকেই অনেকটা বিচ্ছিন্ন ভাব প্রকাশ করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদের কারণে সেখানকার পরিবেশ প্রায়ই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। সম্প্রতি, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলনে সেখানকার পরিবেশ আবারও অরাজক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি, সেখানকার উগ্র সশস্ত্র সংগঠনের সাথে সেনাবাহিনীর দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। অনেক প্রচেষ্টার পর সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আটকে পড়া পর্যটকরা নিরাপদে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে এমন ঘটনা মোটেই অবহেলার নয়।
পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিদের সাথে সাধারণ বাঙালিদের বিরোধপূর্ণ ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পার্বত্য অঞ্চলের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। কিন্তু, মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। উপজাতিদের নিয়ন্ত্রণ করা মানে তাদের স্বাধীনতা হরণ করা নয়, বরং সুশৃঙ্খলভাবে তাদের জীবনকে উন্নত করাই মূল লক্ষ্য। এজন্য সেখানে শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামো প্রভৃতি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় পাহাড়ে এখনও তেমন কোনো যুগপৎ উন্নয়ন হয়নি। কিন্তু, উন্নয়ন প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সেখানকার কিছু উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের কারণে। পাহাড়কে তাঁরা নিজেদের দখলে রাখতে চায় এবং নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে চায়। দেশের প্রচলিত সরকার কাঠামো অনুযায়ী উপজাতিদের স্থানীয় সরকারের আওতায় আনার জন্য সরকারকে চেষ্টা করতে হবে। ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উপজাতিদের বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইনের আওতায় আনতে হবে। উপজাতিদের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। তবে তাদের মধ্যে দেশের গঠনতন্ত্র মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি উপজাতির মানুষকে দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াতে হবে। সরকারের উদ্যোগে যথাযথভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটাতে হবে এবং সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অপার সম্ভাবনার জায়গা। পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে উপজাতিদের সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। কেননা সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁরা উচ্চ ধারণা রাখে। তাছাড়া শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অগ্রগতি বাড়লে সেখানকার সাধারণ মানুষ বিপথগামীদের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে পারবে। উপজাতিদের মধ্যে শিক্ষিত প্রতিনিধি তৈরি করতে হবে। এতে করে তাঁদের মধ্যে শৃঙ্খলা বাড়বে। শুধু পর্যটনশিল্প নয়, সেখানে কৃষি ও কুটিরশিল্পকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে বাণিজ্য ক্ষেত্রেও উন্নয়ন সম্ভব। এছাড়া প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপজাতিদের দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কতিপয় উগ্রবাদীদের প্রশ্রয় দেওয়া মোটেই ঠিক হচ্ছে না। পাহাড়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্প গঠন করে সকল ধরনের অবৈধ অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে দিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে সেখানে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটা ভিডিওতে দেখা যায়, অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরির মুখে আন্দোলনকারী উপজাতিরা অযাচিতভাবে বাধা দিচ্ছে। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এটা লজ্জাজনক। বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর সাথে কোনো সমঝোতা নয়, বরং তাদেরকে সমূলে উপরে ফেলাই যৌক্তিক সমাধান। কেননা তাঁরা সাধারণ উপজাতিদেরকে উস্কানির মাধ্যমে বিপথগামী করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেখানকার স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো শুধু উগ্রতার কারণেই অরাজকতা করছে না, বরং তাঁরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথেও জড়িত। পাহাড়ে আগত পর্যটক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে চাঁদাবাজি, রাহাজানি করে বেড়ায় তাঁরা। সেখানে একাধিক সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে, যারা আধিপত্য ধরে রাখতে কখনো নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়ায়, আবার কখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এই সংগঠনগুলো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রাখে এবং নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ড চালায়। এসব সংগঠনের দ্বারা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের সাথে জোটের মাধ্যমে আমাদের দেশের বড় ক্ষতির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
পাহাড়ের গহীনে সীমান্তবর্তী এলাকায় এধরণের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর গতিবিধি মোটেই সাধারণ নয়। দীর্ঘদিনের এসব অস্থিতিশীলতা দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে যে, সেনাবাহিনী এতো শক্তিশালী হয়েও উগ্র সংগঠনগুলো ধ্বংস করতে পারছে না কেন? কিংবা এতো ভারী অস্ত্র সংগঠনগুলো কোথায় পাচ্ছে? দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে গোপন তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী অভিযান চালানো হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে সেনাবাহিনী স্বাধীনভাবে অপারেশন পরিচালনা করতে পারছে না। বর্তমান পরিস্থিতি এমনও প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, এসব সশস্ত্র সংগঠনের সাথে সরকার কাঠামোর কোনো দূর্নীতিবাজের গোপন চুক্তি আছে কি-না। যদি তা-ই হয়, তবে পাহাড়ে বিদ্যমান বিপথগামী সশস্ত্র সংগঠনগুলো পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করতে সেনাবাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
সম্প্রতি রাঙামাটির সাজেকে আন্দোলনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে এক স্থানীয় লোক বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলনের ফলে পর্যটন এলাকা বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে সেখানকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ বাসিন্দারা। যাতায়াত বন্ধ থাকার ফলে খাদ্য সংকটেও পড়ে তাঁরা এবং বেচাকেনা বন্ধ থাকার ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দেশের অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, পর্যটকদের প্রাণসংশয় ঘটে, যা দেশের পর্যটন খাতের জন্য হুমকি। সংকট নিরসনে পর্যটক ও সাধারণ বাঙালিদেরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে। সাধারণ পাহাড়িদের প্রতি আমাদের সবসময় সহনশীল থাকতে হবে। পর্যটন এলাকায় গিয়ে সেখানে অহেতুক কোনো ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। উপজাতিদের বাঙালি মনে করতে হবে, তাঁরাও আমাদের মতোই এদেশের মানুষ। আমাদের মতো তাঁদেরকেও সমানভাবে নাগরিক অধিকার দিতে হবে। সমতলের সাথে সাথে পাহাড়েও সুশৃঙ্খলভাবে উন্নতি ঘটলে বাংলাদেশ দ্রুতই এগিয়ে যাবে। এজন্য পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের সর্বত্র সঠিক সমন্বয় রক্ষা করা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া