সিসা দূষণ ও আমাদের ভবিষ্যৎ

মায়েদা ইসলাম মুন:
মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অনেক কিছুই অদৃশ্য হয়ে আমাদের চারপাশে রয়েছে যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। এসব উপাদান নিঃশব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেহের মারাত্মক ক্ষতি করে। সিসা এমন একটি রাসায়নিক ধাতু যা প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এবং এটি একটি অদৃশ্য ঘাতক হিসেবে কাজ করে। চকচকে নীলচে ছাই রঙের ও নরম হওয়ার কারণে আগুনে এটি সহজেই গলে যায়। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্রে সিসার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সিরামিকের বাসনপত্র পুরোনো দেয়ালের রং খেলনা রান্নায় ব্যবহৃত হলুদের গুঁড়া প্রসাধনী পানির পাইপ পুরোনো ব্যাটারিসহ অসংখ্য জিনিসে সিসা থাকে। পরিবেশ থেকে পরে মাটি পানি ও বায়ুর মাধ্যমে এটি মানবদেহে প্রবেশ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতিদিন মানুষের দেহে ক্ষুদ্র কণা হিসেবে হলেও সিসা প্রবেশ করে। মানবদেহের জন্য অল্প পরিমাণ সিসাও মারাত্মক ক্ষতিকর এবং এর কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এটি মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন মস্তিষ্ক কিডনি রক্ত লিভার পাকস্থলী ও প্রজননতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে যা একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে।
প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের জন্য সিসা দূষণ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। সামান্য সিসার সংস্পর্শে এলেও তাদের স্বাভাবিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। একই পরিমাণ সিসার সংস্পর্শে এলে শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শরীরে বেশি সিসা শোষণ করতে পারে। বিশেষ করে পুষ্টির ঘাটতি থাকলে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। শিশুরা খেলাধুলার সময় মাটি ধুলাবালি ও খেলনা স্পর্শ করে। অনেক সময় হাত মুখে দেওয়ার অভ্যাসের কারণে দূষিত ধুলা বা মাটির কণা সহজেই তাদের শরীরে প্রবেশ করে।
সিসা দূষণ শুধু একটি শিশুর ব্যক্তিগত সমস্যা নয় বরং এটি সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। আজকের শিশুরাই আগামীর প্রজন্ম যারা ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। সিসার প্রভাবে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে শেখার সক্ষমতা কমে যায় যা মেধাবী প্রজন্ম গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে পরিবার থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়। এমনকি মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়ের শরীরে সিসার উপস্থিতি অনাগত সন্তানের মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সিসাজনিত স্বাস্থ্যসমস্যা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় অতিরিক্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় তৈরি হয়। এভাবেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়তে পারে।
এই নীরব ঘাতক থেকে বাঁচতে আমাদের চারপাশে এ ধরনের সব ক্ষতিকর পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। মানবদেহের জন্য হুমকিস্বরূপ সবকিছু বর্জন করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় অনেক খাবারেও সিসা মিশিয়ে থাকেন। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ ক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ক্ষতিকর এসব উপাদানের বর্জন ও সচেতনতা বৃদ্ধি ব্যক্তি পরিবার ও সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী, তিতুমীর কলেজ।