সনদ আছে, কর্মসংস্থান কোথায়?

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
মরিয়ম ফেরদৌস:
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর এই শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও মনন বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে একজন তরুণ উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। পরিবারের আশা পূরণ এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার প্রত্যয়ে তিনি বছরের পর বছর পড়াশোনা করেন। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে হাতে সনদ থাকলেও যখন কাঙ্ক্ষিত চাকরি মেলে না, তখন সেই স্বপ্ন পরিণত হয় হতাশায়। বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ এখন কর্মসংস্থান। তাই চাকরিপ্রার্থীদের মনে আজ প্রশ্ন জাগে—সনদ আছে, চাকরি কোথায়?
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ অর্জন করছেন। তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি সম্মানজনক চাকরি পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। সরকারি চাকরিতে সীমিত পদ, বেসরকারি খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের অভাবে অনেক শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘদিন বেকার থাকছেন।
অনেক চাকরিপ্রার্থী বছরের পর বছর বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। আবেদন ফি, যাতায়াত ও প্রস্তুতির খরচ বহন করতে গিয়ে তাদের পরিবারকে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে অনেক সময় কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অভিজ্ঞতার শর্ত তরুণদের জন্য বাড়তি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম কারণ হলো শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান না। তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগদক্ষতা, ইংরেজি ভাষা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির তুলনায় চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। অনেক তরুণ মনে করেন, সরকারি চাকরিই নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনের একমাত্র পথ। ফলে বেসরকারি চাকরি, কারিগরি পেশা, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা আত্মকর্মসংস্থানের সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়। পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কষ্ট অনেককে মানসিক চাপে ফেলে। কেউ কেউ নিজের যোগ্যতার তুলনায় কম বেতনের কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হন। আবার অনেকে জীবিকার তাগিদে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিন্ন পেশায় চলে যান।
এই পরিস্থিতির প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। শিক্ষিত তরুণদের জ্ঞান, মেধা ও শ্রম যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হয়। দক্ষ জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের অভাবে মানবসম্পদের পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হয় না। তাই শিক্ষিত বেকারত্ব কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়,এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং চাকরিপ্রার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী করতে হবে। পাঠ্যক্রমে কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষানবিশ কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যোগ্য প্রার্থীরা ন্যায্য সুযোগ পান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় থেকেই বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন, পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল সেবা ও আত্মকর্মসংস্থানও হতে পারে সম্ভাবনাময় পথ।
শিক্ষার সনদ একজন মানুষের পরিশ্রম, মেধা ও স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু সেই সনদ যদি কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে না পারে, তবে শিক্ষার উদ্দেশ্য অনেকাংশে ব্যাহত হয়। দেশের তরুণসমাজকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই সময়ের দাবি, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ স্থাপন এবং তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা। তাহলেই সনদধারী তরুণদের হতাশা কমবে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং বাস্তবায়িত হবে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।