মানুষ মানুষের জন্য

“মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”, গানটির এই চিরন্তন বাণী আজ কেবল সুরের মূর্ছনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে!
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সমাজের ভেতরের উদাসীনতা ও অমানবিকতার এমন এক নির্মম চিত্র উন্মোচন করেছে, যা বিবেকবান মাত্রই নাড়া দেবে এবং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করবে। গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে ঢাকার মেট্রোরেলে শাহবাগ থেকে উত্তরা ফেরার পথে শেওড়াপাড়া স্টেশনের কাছাকাছি বয়স্ক এক ব্যক্তি আকস্মিক স্ট্রোক করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তিনি শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করে আশেপাশের লোকজনের কাছে একটু বসতে চেয়েছিলেন, যাতে প্রাণভ্রোমর রক্ষা পায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, মেট্রোর ভিড়ে কেউ তাকে একটু বসার জন্য জায়গা ছেড়ে দেননি। ফলশ্রুতিতে, দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তিনি স্ট্রোক করে নিচে পড়ে যান এবং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।
সন্তানের আকুল আর্তনাদ আর কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করার যে মহত্ত্ব, তা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের ওপর এক বিশাল চপেটাঘাত। ঘটনার পর নিহতের সন্তান লিখেছেন, “আমার বাবা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করে নিচে পড়ে যান। আল্লাহ তার মৃত্যুকে সহজ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে এইটুকু মেনে নেওয়া কষ্টকর। আমার কোনো রাগ অভিমান নাই, শুধু এইটুকুই বলব, চলতে ফিরতে বয়স্ক বা সিনিয়র সিটিজেনদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন। আপনি আজকে যাকে ইগ্নোর করলেন, সে আপনার বাবা না হলেও, অন্য কারো বাবা।”
এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা, বিশেষ করে গণপরিবহনে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা চরম অসংবেদনশীলতার একটি প্রতীকী রূপ। মেট্রোরেল বা অন্যান্য গণপরিবহনে বয়স্ক, অসুস্থ, শারীরিক প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য কিছু আসন “অগ্রাধিকার সীট” হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তিরা দিব্যি সেই আসনগুলোতে বসে থাকেন এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষের দিকে একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, তারা যেন অন্ধ সেজে থাকেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, আমাদের মনুষ্যত্ব কি এতটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে? আমরা কি এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি যে, পাশের মানুষটির কষ্ট বা জীবন-মৃত্যুর লড়াইটুকুও আমাদের চোখে পড়ে না? একটুখানি সহমর্মিতা বা সিট ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা কি আমাদের এতই কৃপণ করে তুলেছে?
মেট্রোরেল বা যেকোনো গণপরিবহন কেবল যাতায়াতের আধুনিক মাধ্যমই নয়, এটি আমাদের নাগরিক সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মানসিকতারও একটি বড় আয়না। একটি সভ্য জাতি হিসেবে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা, বয়স্ক ও অসুস্থদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তাদের সামান্য স্বস্তি দেওয়ার মানসিকতা আমাদের নিজেদেরই গড়ে তুলতে হবে। অগ্রাধিকার সীটের যথাযোগ্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে একটু মানবিকতার হাত বাড়িয়ে না দেওয়া আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট লজ্জার বিষয়।
এখনই সময় আত্মসমালোচনার। আইন করে, নোটিশ ঝুলিয়ে বা জরিমানা করে মানুষের ভেতরের মানবিকতা জাগিয়ে তোলা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন অন্তরের জাগরণ ও মূল্যবোধের চর্চা। আসুন, আর কোনো সন্তান যেন তার বাবার এমন অবহেলার শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়, সে বিষয়ে প্রত্যেকে সজাগ হই। গণপরিবহনে বয়স্ক, অসুস্থ বা দুর্বল যাত্রীদের দেখলেই নিজের আসনটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছেড়ে দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। হাত জোড় করে নয়, আমাদের শুভবুদ্ধি, সচেনতা ও মানবিকতার জোরেই হোক এই পরিবর্তন। কারণ, দিনশেষে আমরা সবাই মানুষ, আর “মানুষ মানুষের জন্য”।
সংগঠক, লেখক এবং আইনের শিক্ষার্থী