শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

মেট্রোরেলে শিক্ষকের মৃত্যু, মানবতা প্রশ্নবিদ্ধ

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

মানুষে মানুষে দূরত্ব সব সময় মাপা যায় না কিলোমিটার কিংবা মিটারের হিসাবে। কখনো কখনো পাশাপাশি দাঁড়িয়েও মানুষ একে অপরের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকে। একই বগিতে, একই গন্তব্যে যাত্রা করেও একজন মানুষের অসহায়ত্ব অন্যের হৃদয় স্পর্শ করে না। ঢাকার মেট্রোরেলে একজন শিক্ষকের মৃত্যু আমাদের সেই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আধুনিক গণপরিবহণের সঙ্গে আমাদের নাগরিক মানসিকতারও কি সমান উন্নতি ঘটেছে?

গত ২৪ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নজীবুর রহমান মেট্রোরেলে অসুস্থ হয়ে মারা যান। ৬৪ বছর বয়সি এই শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠান শেষে শাহবাগ স্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে ট্রেনে উঠেছিলেন। কয়েক দিনের ছুটি শেষে সেদিন ভিড় ছিল প্রচণ্ড। শেওড়াপাড়া এলাকায় ঠেলাঠেলির মধ্যে তিনি অসুস্থবোধ করেন। তাঁর ছেলের ভাষ্য, বসে থাকা যাত্রীদের কাছে কয়েকবার বসার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কেউ সাড়া দেননি। এক-দুই মিনিটের মধ্যে তিনি মেঝেতে পড়ে যান। হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

এই খবরের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ ছেলের আক্ষেপ : ‘কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন!’ একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমি কাউকে দোষারোপ করছি না।’ তাঁর মনে এই প্রশ্ন থেকে যাবে, কেউ যদি তাঁর বাবাকে একটু বসতে দিতেন। হয়ত সেই সামান্য সুযোগে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। যদিও একটি আসন ছেড়ে দিলে তাঁর মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতো কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের আকুতি যদি আশপাশের মানুষের বিবেচনাতেও জায়গা না পায়, তবে সেই সমাজের মানবিক বোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

গণপরিবহণে আসন সীমিত, যাত্রী অসংখ্য। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শেষে ক্লান্ত মানুষও নিজের প্রয়োজনেই বসে থাকেন। কিন্তু বার্ধক্য বা অসুস্থতায় কেউ যখন দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্য হারান, তখন তাঁর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিছক সৌজন্য নয়, নৈতিক দায়িত্ব। বাইরে থেকে কারও শারীরিক অবস্থা বোঝা যায় না। তাই কেউ অসুস্থ বোধ করার কথা জানালে তা উপেক্ষা করা বিপজ্জনক। সহায়তার পথ একটিই নয়। কেউ আসন ছাড়তে পারেন, কেউ অন্য যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, কেউ কর্মীদের খবর দিতে পারেন। অথচ ভিড়ের মধ্যে আমরা ধরে নিই, সাহায্যের দায়িত্ব অন্য কেউ নেবেন। এই ‘অন্য কেউ’ মানসিকতাই দায় এড়ানোর সংস্কৃতি তৈরি করে।

মেট্রোরেল আধুনিক নগরজীবনের বড় অর্জন। যানজটের শহরে এটি যাতায়াত সহজ করেছে। কিন্তু অবকাঠামোর আধুনিকতা আর নাগরিক মানসিকতার আধুনিকতা এক বিষয় নয়। উন্নয়নের আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত সমাজ তার দুর্বল সদস্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। ভিড়ে ভারসাম্য হারানো বৃদ্ধ, শিশু, নারী কিংবা চলাচলে অসুবিধায় পড়া প্রতিবন্ধী যাত্রী, তাঁদের প্রতি আচরণেই নাগরিক সভ্যতার পরিচয়।

আমাদের নাগরিক সভ্যতার উন্নতি প্রয়োজন, মানবিক বিবেচনাবোধের উন্নতি প্রয়োজন। শুধু শোক প্রকাশ নয়, ব্যবস্থারও প্রয়োজন। একই সাথে দায় কেবল যাত্রীদের নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও। মেট্রোরেলে অসুস্থ কোনো যাত্রী হঠাৎ বিপদে পড়লে কীভাবে দ্রুত সহায়তা পাবেন, সেই ব্যবস্থা সহজ ও কার্যকর হওয়া জরুরি। বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে কর্মীদের দ্রুত সাড়া নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে। অধ্যাপক নজীবুর রহমানকে ট্রেন থেকে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় ৯৯৯-এ ফোন করার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে, জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যাতে বিপদে পড়া যাত্রীকে দ্রুত সাহায্য করা যায় এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়ানো সম্ভব হয়।

পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনে নাগরিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়াতে হবে। মানবতা শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়, এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে প্রকাশ পায়। নিজের আসনে বসে থাকা কিংবা অন্যের জন্য ছেড়ে দেওয়া, বিপদ দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

মেট্রোরেল আমাদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের গন্তব্য কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তি দিতে পারবে না। তার উত্তর দিতে হবে আমাদের বিবেক ও আচরণকে।

পরবর্তী কোনো যাত্রায় একজন অসুস্থ মানুষ সাহায্য চাইলে আমরা কী করব, সেটিই আমাদের মানবিকতার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে আমাদের আধুনিকতার অহংকার যত বড়ই হোক, মানবতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে।

লেখক: হাবিব আল মিসবাহ, শিক্ষার্থী, আল-কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।