বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

জ্বালানির ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

মোনা তাসনিম মুনিরা:

সভ্যতার চাকা সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। একসময় ভূরাজনীতি মূলত সামরিক শক্তি এবং ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হলেও বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ লাইনের নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির আধিপত্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তবে আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক, তার চাকা ঘোরাতে এখনো জ্বালানি প্রয়োজন। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র কী বন্দুক নাকি জ্বালানি?

বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানির প্রভাব
জ্বালানি নিয়ে রাজনীতি অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই তেল ও গ্যাস বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একটি দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানা, পরিবহনব্যবস্থা থেকে শুরু করে কৃষির সেচ সবকিছুর সঙ্গে জ্বালানি জড়িয়ে আছে। ফলে জ্বালানির সংকট মানে শুধু অন্ধকার ঘর নয়, এর অর্থ উৎপাদন কমে যাওয়া, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হওয়া।

সাম্প্রতিক বিশ্ব ও জ্বালানির রাজনীতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সেই বাস্তবতাই দেখিয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের জ্বালানিনির্ভরতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ইউরোপকে বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ একটি যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা পৌঁছে গেছে রান্নাঘর, শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষের ব্যয়ের হিসাবেও।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসসম্পদের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির তেলই দামি হয় না, পরিবহন ব্যয় থেকে খাদ্যপণ্য সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ জ্বালানির রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রাজনীতিতেও পরিণত হয়।

নবায়নযোগ্য শক্তি ও সম্পদের নতুন প্রতিযোগিতা
তবে ভবিষ্যতের গল্প হয়তো শুধু তেল গ্যাসকে ঘিরে থাকবে না। বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাচ্ছে, তখন নতুন কিছু সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেলসহ বিভিন্ন খনিজ এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে তেলের ওপর নির্ভরতা কমলেও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা শেষ হবে না। বরং প্রতিযোগিতার কেন্দ্র বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও করণীয়
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়ন যত এগোবে, জ্বালানির প্রয়োজনও তত বাড়বে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কিনতে হলে শুধু জ্বালানির দাম নয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাও বিবেচনায় নিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে তার ঢেউ বাংলাদেশেও এসে লাগবে এটাই স্বাভাবিক।

তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। আমাদের ভাবতে হবে একটি উৎসে অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, দেশীয় সম্পদের ব্যবহার কতটা কার্যকর, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিকল্প উৎসকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা জ্বালানি নিরাপত্তা আসলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে দেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির জন্য অতিরিক্তভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, সংকটের সময়ে তার দর কষাকষির ক্ষমতাও সীমিত। আর যে দেশ নিজের উৎস, সরবরাহপথ ও বিকল্প ব্যবস্থা যত বেশি নিশ্চিত করতে পারে, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও তত বেশি থাকে। তাই আগামী দিনের ভূরাজনীতিতে শুধু প্রশ্ন হবে না কার হাতে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র, প্রশ্ন হবে কার হাতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, কার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং কে চাইলে অন্যের সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করতে পারে। পৃথিবী যুদ্ধের ভাষা বদলাতে পারে, কিন্তু শক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। ভবিষ্যতের লড়াইয়ে জ্বালানি নিজেই হয়ে উঠবে সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে প্রভাবশালী অস্ত্র। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।