শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

অ্যালগরিদম যেভাবে সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

রুশাইদ আহমেদ:

একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে আবিষ্কৃত হওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে বিশ্ববাসীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। গৎবাঁধা জীবনপ্রণালি, মিথস্ক্রিয়ার ধরন, যোগাযোগের ঘরানা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে এই প্রযুক্তি। এতে করে মানুষেরা যেমন ভার্চুয়াল জগতে সহজেই কার্যকর মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের ধোঁকায় পড়ে সামাজিক সংহতির জন্য বিপদ ডেকে আনছেন নিজেদের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধির তোয়াক্কা না করে। ফলে বহু ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের দাসে পরিণত হচ্ছেন। অসাধু অপরাধী চক্রের সদস্যরাও এই প্রাযুক্তিক অপকারিতাকে অপব্যবহার করে নিজেদের সমাজবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখছেন। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে নানা ইস্যুতে সমাজে বিশৃঙ্খলার জন্ম দিচ্ছেন তাঁরা। বিনিময়ে হাসিল করে নিচ্ছেন স্ব স্ব ফায়দা।

অ্যালগরিদমকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রযুক্তিবিদ নানা উপায়ে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। মোটের ওপর অ্যালগরিদম হলো কম্পিউটার কিংবা আধুনিক যন্ত্র ও সফটওয়্যারসমূহের এমন এক শিখনপ্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে উন্নত করে প্রতিনিয়ত। আয়ারল্যান্ডে দীর্ঘদিন মার্কিন মালিকানাধীন ইউনাইটেড হেলথ গ্রুপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহমুদের ভাষায়, কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল যন্ত্র ও সফটওয়্যারকে বিভিন্ন কাজ করার পর্যায়ক্রমিক নির্দেশনা দেওয়া এবং সেগুলোর প্রতিপালনই হলো অ্যালগরিদম প্রযুক্তি। সেই আঙ্গিক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের কাজ হলো প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিনিয়ত উচ্চ ইন্টারেকটিভ কনটেন্টগুলোকে আরও বেশি সংখ্যক ব্যবহারকারী কিংবা দর্শকশ্রোতার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। এতে করে কনটেন্টগুলোর ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। বাড়ে প্ল্যাটফর্মগুলোর মুনাফা লাভের সম্ভাবনার হারও।

মূলত সামাজিক সংহতি হলো এমন এক ধারণা, যার মাধ্যমে সমাজের বিদ্যমান সব পক্ষের অংশীদাররা পারস্পরিক আস্থার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সম্পন্নের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে থাকেন। ইতিহাসের পাতা হতে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোড়াপত্তন ঘটেছিল বিশ্বায়ন, বৈশ্বিক গ্রাম ও সামাজিক সংহতির এই মৌলিক ধারণাসমূহকে কেন্দ্র করে। এর মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ হ্রাস, স্থান কাল পাত্রভেদে সকলের মধ্যকার সামাজিক বন্ধন দৃঢ়করণ এবং সর্বজনীন শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা উৎপাদন করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য পাল্টেছে। ডিজিটাল ঘৃণা, অপতথ্য, কুতথ্যের ভিড়ে সয়লাব হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মগুলো। ফলে যে মঞ্চগুলো সামাজিক সংহতি বিকাশের লক্ষ্যে জন্ম লাভ করেছিল, সেগুলোই আজ সামাজিক সংহতির জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটকের মতো বহুল ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম যেভাবে কাজ করে তা নিয়ে ভারতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে নিবন্ধ লিখেছেন প্রতিষ্ঠানটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড টেকনোলজির ফেলো সৌম্য অবস্থি। সেখানে তিনি দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম প্রযুক্তির সুবাদে এখন স্রেফ উচ্চ ইন্টারেক্টিভ ম্যাটিক্সের কনটেন্টগুলো ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা বহুগুণে বেড়েছে। এগুলো মূলত ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল মিথস্ক্রিয়া, সম্পৃক্ততা, আচরণ ও পছন্দ অপছন্দের নিরিখে নির্ধারিত হয়।

তবে এ ক্ষেত্রে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়, তা হলো বেশি রিয়্যাকশন, কমেন্ট বা শেয়ার হওয়া কনটেন্টগুলো সমাজে ঘৃণা বা সংঘাতের সম্ভাবনা ছড়াচ্ছে কি না কিংবা সামাজিক সংহতির জন্যে সেগুলো ক্ষতিকর কি না, তা নজরদারি করার তেমন কোনো পদ্ধতি মাধ্যমগুলোতে নেই। এ কারণে প্রায়শই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে উসকানিমূলক কনটেন্টসমূহ স্রেফ উচ্চ ইন্টারেকশন হারের কারণে অ্যালগরিদমের বদৌলতে অধিক হারে ব্যবহারকারীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে অনেকে বিচারবুদ্ধির পরোয়া না করে সেগুলোর দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার অপতথ্য ও গুজবসংক্রান্ত পোস্টগুলো যাচাই না করেই শেয়ার করে দিচ্ছেন কিংবা মন্তব্য করছেন, যা পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলে শেষ পর্যন্ত সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে। এদিকে ২০২৫ সালে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো হতে ক্ষতিকর কনটেন্টসমূহ চিহ্নিতকরণের দায়িত্বে থাকা মডারেটর পদ বিলুপ্ত ঘোষণা করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কেননা এই সিদ্ধান্তের কারণে এখন মাধ্যমগুলোতে শুধু ব্যবহারকারীরা কোনো কনটেন্টের বিষয়ে রিপোর্ট জানালে, স্রেফ তখনই ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো। সম্প্রতি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এ ধরনের বেশ কয়েকটি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ভাইরাল হওয়ার ঘটনা তারই প্রমাণ দেয়। পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিভাগ রংপুরের একটি উপজেলায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ধর্মীয় সংঘাতের ঘটনাও ঘটে ফেসবুকে একটি কনটেন্ট পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে। সমাজবিজ্ঞানীদের চোখে এ ধরনের দৃষ্টান্ত এরই মধ্যে সামাজিক সংহতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে প্রতীয়মান হতে শুরু করেছে।

বিশ্বের সব আবিষ্কারেরই যুগপৎভাবে উপকারী ও অপকারী দিক থাকে স্বাভাবিকভাবে। তবে জনকল্যাণ ও সামাজিক সংহতি নিশ্চিতের লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই সব আবিষ্কারের সদ্ব্যবহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তার ব্যতিক্রম নয় এই দৃষ্টিকোণ থেকে। এ ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় হলো সাধারণ বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগানো। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনোকিছু ভাইরাল হলেই অ্যালগরিদমের ফাঁদে পা না দিয়ে তা যাচাই করতে হবে যে, কনটেন্টের তথ্যগুলো সঠিক কি না। এরপর সেগুলোতে রিয়্যাক্ট, কমেন্ট কিংবা শেয়ার করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শান্তি বিনষ্টে উসকানিমূলক কনটেন্টের প্রচার ও প্রসার নিয়ন্ত্রণে দেশের নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে অযাচিত কনটেন্ট অপসারণে প্ল্যাটফর্মগুলোর পদক্ষেপ না নেওয়ার শর্তে জরিমানা করতে জার্মানির নেটজ আইনের (NetzDG) মতো বিষয়াদি বিবেচনা করা যেতে পারে। এই আইনের আওতায় দেশটি ২৪ ঘণ্টার ভেতরে যেসব কনটেন্ট গুজব, অপতথ্য কিংবা কুতথ্য ছড়াচ্ছে সেগুলোকে চিহ্নিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষগুলোকে সরিয়ে ফেলতে বলে। অন্যথায় বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হয় প্ল্যাটফর্মগুলোকে। তবে এ ধরনের আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষগুলোর পক্ষ হতে তাদের নীতিমালার বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অ্যালগরিদমের ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের নজরদারির বিষয়ে আশু প্রেক্ষাপটসমূহ বিবেচনা করা অধিক জরুরি। এতে পক্ষপাতিত্ব ব্যতিরেকে ক্ষতিকর কনটেন্টের প্রসার হ্রাস করার প্রক্রিয়া সহজতর হতে পারে।

সার্বিকভাবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ বাসযোগ্য সমাজ বিনির্মাণে সামাজিক সংহতির ওপর বারবার জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোক কিংবা বাস্তবজীবন সর্বত্রই জনকল্যাণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিতে হবে আমাদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যান্ত্রিক অ্যালগরিদমবিশিষ্ট প্রযুক্তি, সুযোগসন্ধানী অপরাধী চক্র এবং করপোরেট মুনাফালোভীদের হানিকর প্রবণতার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে পারলেই সেটি সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।