জাতিসংঘ বিশ্বকে কতটা এক করতে পেরেছে?

হাবিব আল মিসবাহ:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন জাতিসংঘের জন্ম, তখন বিশ্বের সামনে একটি বড় প্রত্যাশা ছিল। আর কোনো যুদ্ধ যেন কোটি মানুষের জীবন কেড়ে না নেয়, শক্তিশালী রাষ্ট্র যেন দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর ইচ্ছেমতো বলপ্রয়োগ করতে না পারে, মানবাধিকার যেন কেবল কাগজের শব্দ হয়ে না থাকে। সনদে শান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে প্রতিশ্রুতি লেখা হয়েছিল, তা ছিল মানবসভ্যতার নতুন অঙ্গীকার। কিন্তু আট দশক পর প্রশ্নটি আরও কঠিন, জাতিসংঘ কি সত্যিই বিশ্বকে এক করতে পেরেছে, নাকি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের কাছে তার নৈতিক কর্তৃত্ব বারবার আটকে গেছে?
যা অর্জিত হয়েছে
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনো পর্যন্ত ঠেকানো গেছে। উপনিবেশবাদের অবসানে বহু দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা, শরণার্থী সুরক্ষা, বসন্ত রোগ নির্মূল, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাজ কোটি মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশের সেনা ও পুলিশ সদস্যরা শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে এই সংস্থার কাজের অংশীদার হয়েছেন। তবু যে প্রতিষ্ঠানের মূল প্রতিশ্রুতি শান্তি ও নিরাপত্তা, তার পরীক্ষা হয় সেখানেই, যেখানে ক্ষমতাধরের স্বার্থ জড়িয়ে যায়। ফিলিস্তিনের গাজা সেই পরীক্ষার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণগুলোর একটি।
গাজা: ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় যা ঘটেছে, তা এই ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে, আহত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি, যাদের বড় অংশ নারী ও শিশু। হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষণের আন্তর্জাতিক কাঠামো ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন বা আইপিসি গাজা নগরীতে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত করেছে। জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর তিন শরও বেশি কর্মী নিহত হয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংস্থা নিজের কর্মীদেরই রক্ষা করতে পারেনি।
তাই একটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্নটি শুধু ইসরায়েল কী করেছে তা নয়। প্রশ্ন হলো, বিশ্ব তা থামাতে কী করেছে?
উত্তরের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোতেই লুকিয়ে আছে। ১৫ সদস্যের এই পরিষদে পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন ভেটো ক্ষমতা রাখে। এদের যেকোনো একটি ভেটো দিলে বাকি সদস্যদের বিপুল সমর্থনও অকার্যকর হয়ে যায়। গাজার ক্ষেত্রে এর উদাহরণ একাধিকবার দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি গাজায় অবিলম্বে মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোতে আটকে যায়। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর পরিষদের নির্বাচিত ১০ সদস্যের উত্থাপিত প্রস্তাবে অবিলম্বে, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবি জানানো হয়। পক্ষে ভোট দেয় ১৪টি দেশ, বিপক্ষে শুধু যুক্তরাষ্ট্র। সেই একটি ভোটই প্রস্তাবটি আটকে দিতে যথেষ্ট ছিল। ২০২৫ সালের ৪ জুনও একই চিত্র। যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে ১৪টি দেশ পক্ষে ভোট দেয়, একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরও আরেকটি প্রস্তাব একই ভোটে ব্যর্থ হয়।
তাহলে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ একমত হলেও কেন একটি রাষ্ট্রের ভেটো সেই ঐকমত্য অকার্যকর করে দিতে পারে? এখানেই জাতিসংঘের কাঠামোগত সংকট। সাধারণ পরিষদ ১৫৩টি দেশের সমর্থনে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু সেসব প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে গেছে। তাই এখানে ব্যর্থতা কাঠামোরই ফল। যে দেশ সংঘাতের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক, সেই দেশই পরিষদে বিচারক।
অবশ্য ভেটোর রাজনীতি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একার নয়। সিরিয়া ও ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়া এবং বিভিন্ন ইস্যুতে চীনও ভেটো ব্যবহার করেছে। তাই সমস্যাটি কোনো একটি দেশের নয়, বরং ব্যবস্থার। তবু গাজায় এর মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, হাজার হাজার বেসামরিক নিরপরাধ নারী ও শিশুকে। মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রে এটি যেন বারবার দেখা যায়। ২০০৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ইরাকে হামলা হয়েছে, যার পরিণতি আজও দেশটি বইছে। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধ এবং লিবিয়ায় ২০১১ সালের সামরিক হস্তক্ষেপের পর রাষ্ট্রকাঠামোর ভাঙনও একই প্রশ্ন তোলে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কখনো পাশ কাটিয়ে গেছে, কখনো ক্ষমতাধরদের সিদ্ধান্তের সিলমোহর দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা, তবু মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড সমান কি না, প্রশ্ন থেকেই যায়।
আইনি ও নৈতিক রায়, কিন্তু প্রয়োগ নেই
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলায় ২০২৪ সালে গণহত্যা প্রতিরোধে অস্থায়ী নির্দেশ দিয়েছে। একই বছর আদালত মত দিয়েছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল অবৈধ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের নিজস্ব তদন্ত কমিশন সিদ্ধান্তে এসেছে যে গাজায় গণহত্যা ঘটেছে। তবে গণহত্যার মূল মামলায় আইসিজের চূড়ান্ত রায় এখনো আসেনি।
তাই প্রশ্ন থেকে যায়, এসব সিদ্ধান্তের পর কার্যকর কী ঘটেছে? উল্টো যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানেজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সত্য উচ্চারণ করলে শাস্তি, আর বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকলে সেই সত্যের মূল্য কী?
তাহলে কতটা এক করেছে?
জাতিসংঘ বিশ্বকে এক করেছে ঘোষণায়, মঞ্চে আর ত্রাণের তাঁবুতে। মহামারি, শরণার্থী সংকট ও জলবায়ু আলোচনায় দেশগুলোকে এক টেবিলে বসিয়েছে। কিন্তু যেখানে ক্ষমতার স্বার্থ জড়িয়েছে, সেখানে সেই ঐক্য ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘ ঠিক ততটুকুই এক করতে পেরেছে, যতটুকু শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনুমতি দিয়েছে।
এই সংস্থা ভেঙে ফেলা সমাধান হয়তো নয়, কারণ এর বিকল্প হয়তো আরও দুর্বল হবে। সমাধান তাই সংস্কার, ভেটো ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের মতো ক্ষেত্রে ভেটো সীমিত করা, নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং আইসিজে ও আইসিসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কার্যকর পথ তৈরি করা। তা না হলে জাতিসংঘ বিশ্বের বিবেক হয়ে উঠবে না, থেকে যাবে শক্তিমানদের সুবিধামতো একটি মঞ্চ হয়ে।