জমির বিরোধ ও দীর্ঘ আদালতযাত্রা: হয়রানি থেকে মুক্তির উপায় কী

নুসরাত জাহান বৈশাখী:
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জমি শুধু একটি সম্পদ নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা, উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের প্রতীক। একটি ছোট্ট জমির ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। অথচ সেই জমিই যখন বিরোধের কারণ হয়ে আদালতে পৌঁছে যায়, তখন অনেকের জীবন পরিণত হয় দীর্ঘ ও অনিশ্চিত আদালতযাত্রায়। একটি মামলার রায়ের অপেক্ষায় মানুষ হারিয়ে ফেলে জীবনের মূল্যবান সময়, অর্থ ও মানসিক শান্তি।
বাংলাদেশে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জমি সংক্রান্ত। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ভূমিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই দেশে ২ লাখ ৮১ হাজার নতুন জমি সংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে সাত শতাধিক মামলা যুক্ত হয়েছে। মালিকানা, উত্তরাধিকার, সীমানা বিরোধ, খতিয়ান, নামজারি কিংবা দলিলের অসংগতিসহ বিভিন্ন কারণে এসব মামলা তৈরি হয়। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তির গতি তুলনামূলক ধীর হওয়ায় একটি বিরোধ বছরের পর বছর চলতে পারে।
একটি মামলার পেছনে শুধু আদালতের তারিখ থাকে না, থাকে মানুষের অর্থ, সময় ও শ্রমের অপচয়। বারবার আদালতে হাজিরা, আইনজীবীর পারিশ্রমিক, নথিপত্র সংগ্রহ, যাতায়াত ব্যয় এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ফলে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। কেউ কেউ মামলার খরচ চালাতে ঋণ নেন, সঞ্চয় শেষ করেন কিংবা শেষ পর্যন্ত সেই জমিরই অংশ বিক্রি করতে বাধ্য হন। যে সম্পদ রক্ষার জন্য মামলা, অনেক সময় মামলার ব্যয়ের কাছে তার মূল্যও ম্লান হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ও মানসিক ক্ষয়। জমির বিরোধে একই পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ান। ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই, চাচার বিরুদ্ধে ভাতিজা কিংবা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশী এমন বিরোধ পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কখনো একটি মামলা শুধু জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি করে না বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম সম্পর্কের দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়।
বিচারপ্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, দালাল চক্র ও দুর্নীতির অভিযোগও জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে মানুষের মধ্যে এমন ধারণার বিস্তারই দেখায় যে বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করা জরুরি। কারণ ন্যায়বিচার শুধু নিশ্চিত করলেই হবে না, মানুষের কাছে তা দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন নির্ভুল ভূমি রেকর্ড, দক্ষ প্রশাসন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, আধুনিক কেস ম্যানেজমেন্ট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। একই সঙ্গে আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে অনেক জমি বিরোধ দ্রুত মীমাংসা করা সম্ভব।
একজন মানুষের জীবনের বড় অংশ আদালতের বারান্দায় কেটে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক বাস্তবতা হতে পারে না। একটি জমির মামলা যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে উত্তরাধিকার হিসেবে পৌঁছে না যায়। এমন বিচারব্যবস্থা দরকার, যেখানে জমির মালিকানা নির্ধারণে দশকের পর দশক অপেক্ষা করতে হবে না এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য হয়রানির শিকার হবেন না। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ভবন, সড়ক কিংবা অবকাঠামোতে নয় তার বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থায় নিহিত।