বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

অসৎ সঙ্গ ও ডিজিটাল আসক্তি: অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে শিশু কিশোররা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

জান্নাত আক্তার শিলা:

শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ মূলত কৈশোরকাল থেকেই পূর্ণতা পেতে শুরু করে। কিশোর ও তরুণ বয়স জীবন গঠনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটে। এ সময় তীব্র আবেগ কাজ করে, সবকিছু জানা ও শেখার আগ্রহ বাড়ে। ঠিক ভুল বাছাই করার মানসিকতা থাকে না বললেই চলে। তারা নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার যোগ্য মনে করে। শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশে এই সময়টা বড্ড নাজুক, তাই তারা সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

অসৎ সঙ্গ ও নৈতিক অবক্ষয়

বাবা মায়ের অতিরিক্ত শাসন বা ব্যস্ততা এবং পারিবারিকভাবে পর্যাপ্ত সঙ্গ না পাওয়ার কারণে অনেক সময় বন্ধুরাই সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠে। একজন কিশোর যখন কোনো খারাপ সঙ্গীর পাল্লায় পড়ে, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়। কৌতূহলবশত কিংবা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথমে ধূমপান থেকে শুরু করে ক্রমশ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তির এই পথ ধরে জন্ম নেয় কিশোর গ্যাং, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। খারাপ সঙ্গ কেবল তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় না, বরং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকেও অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে। পড়ালেখায় অমনোযোগিতা এবং পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির ফলে তাদের জীবন এক চরম হতাশায় পর্যবসিত হয়।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মানসিক স্বাস্থ্য

এ ছাড়া বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ফোনের ব্যবহার কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। দল বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে রাত জাগা, গেমের ভেতর অশ্লীল গালিগালাজ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং টিকটকে ভাইরাল হওয়ার নেশা তাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। এসব সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন গেমের সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে বাবা মায়ের অগোচরে টাকা খরচ করছে তারা। টিকটক বা রিলসের লাইক, ভিউ ও কমেন্টই হয়ে ওঠে তাদের আত্মমূল্যের মাপকাঠি। জনপ্রিয়তার লোভে অনেকে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ নেয় এবং অনুপযুক্ত কনটেন্ট বানায়, যার ঝুঁকি প্রাণহানি পর্যন্ত গড়াতে পারে। ট্রল ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে বাড়ে হীনম্মন্যতা ও মানসিক চাপ। প্রতিনিয়ত রাত জাগার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং চোখের সমস্যা ও মাথাব্যথা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে খিটখিটে মেজাজ, একাকিত্ব ও উদ্বেগ বাড়ে।

অভিভাবকদের অজ্ঞতা ও পারিবারিক বিপর্যয়

অথচ ব্যস্ততার কারণে অনেক অভিভাবক জানেনই না তাঁদের সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, মোবাইলে কী দেখছে কিংবা কতটা হতাশায় ভুগছে। অভিভাবকেরা টের পেতে পেতে সন্তানেরা অনেকটাই অন্ধকারে জড়িয়ে পড়ে। তখন তাদের ফিরিয়ে আনা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রভাব শুধু কিশোরের ওপর পড়ে না, পরিবার এবং সামাজিক জীবনেও ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। বিপথে পা বাড়ানো কিশোর পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে ওঠে, ফলে অনেকের শিক্ষাজীবন মাঝপথেই থেমে যায়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়। তাদের এসব কাজে পরিবার লজ্জিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়, নেমে আসে অশান্তি ও অর্থকষ্ট। দেশ হারায় একজন সম্ভাবনাময় জনসম্পদ।

উত্তরণের উপায় ও আমাদের করণীয়

শিশু কিশোরদের সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার পথে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি। তাদের সুস্থ ও সুন্দর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথ সুগঠিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

প্রথমত, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। একজন মানুষ পরিবারের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। তাই শিশু কিশোরদের সঙ্গে গল্প করা, একসঙ্গে খাবার খাওয়া, তাদের ইচ্ছা ও আগ্রহ সম্পর্কে জানা, কবিতা, গান বা বই পড়ে শোনানো এবং বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া বা নিয়মিত মাঠে খেলতে দেওয়ার মতো কাজগুলো করলে শিশুর উৎফুল্লতার পাশাপাশি মেধার দ্রুত বিকাশ ঘটবে।

দ্বিতীয়ত, বন্ধু নির্বাচনে সচেতনতা। সন্তানের বিকশিত হওয়ার এই সুন্দর সময়ে তাদের সঠিক বন্ধু নির্বাচনে সহায়তা করা অত্যন্ত জরুরি। সন্তানের বন্ধুদের চেনা, তাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচিত থাকা, সন্তান কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে চলে এবং কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করে এসব বিষয়ে সবসময় নজর রাখা প্রত্যেক অভিভাবকের দায়িত্ব। সময়মতো খোঁজ নিলে ভুল পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ হয়।

তৃতীয়ত, ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ। শিশু কিশোররা অনুকরণপ্রিয়। পরিবার থেকেই তাদের প্রাথমিক বিকাশ ঘটে। তাই তাদের সামনে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, পারিবারিক কলহ, একে অপরকে অসম্মান বা অনুপযুক্ত শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সুসম্পর্ক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ তাদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

চতুর্থত, নৈতিক শিক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা। ছোটবেলা থেকেই ভালো মন্দের পার্থক্য বোঝানো এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার সম্পর্কে উৎসাহিত করলে তারা নিজেরাই সঠিক পথে এগিয়ে যাবে।

পঞ্চমত, প্রযুক্তির পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। বর্তমান সময় প্রযুক্তির যুগ। পড়াশোনার প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। তাদের সৃজনশীলতার বিকাশে শিক্ষামূলক অ্যাপস, ধাঁধা, গণিতের গেমস কিংবা কোডিং শেখায় এমন কনটেন্টের পরিমিত ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

ষষ্ঠত, সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করা। ছবি আঁকা, গান শেখা, নিজের কাজ নিজে করা, কবিতা আবৃত্তি করা, গল্পের বই পড়া, নতুন কিছু তৈরি করা, গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করতে উৎসাহিত করা এবং ঘরের কাজে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের মননশীলতা সমৃদ্ধ হবে।

শিশু কিশোররা আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনে আগামীর কারিগর। তাদের প্রতি যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দেওয়া, পরিবারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়া, নৈতিক শিক্ষা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন, ডিভাইস ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিতকরণ এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে তাদের সুন্দর ও উপভোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ একযোগে সচেতন হলেই আগামীর জনসম্পদ সুস্থ, নৈতিক ও আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে।