বাজারে পণ্যের অভাব নেই, অভাব কেবল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার

মুহিবুল হাসান রাফি:
বাজারে পণ্য আছে, দোকানে সাজানো চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস ও শাকসবজি। সরবরাহের দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখে বাজারকে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব পণ্য কেনার সামর্থ্য কত মানুষের আছে? পণ্যের অভাব না থাকলেও মানুষের জীবনে স্বস্তির অভাব প্রকট। কারণ, বাজারের হিসাব শুধু পণ্যের প্রাপ্যতায় শেষ হয় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাম, আয়, ক্রয়ক্ষমতা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। যে বাজারে পণ্য আছে, অথচ প্রয়োজন অনুযায়ী কেনার সামর্থ্য নেই, সেই বাজার সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির নয়, উদ্বেগের নাম।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এখন শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের সমস্যা নয়। সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষ সবাই এর চাপে রয়েছেন। মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসার পরই শুরু হয় হিসাব নিকাশ। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, যাতায়াত, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও খাবারের খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমাতে হচ্ছে। মাছ ও মাংসের পরিমাণ কমছে, ফল কেনা পিছিয়ে যাচ্ছে, পুষ্টিকর খাবারের জায়গা নিচ্ছে তুলনামূলক সস্তা বিকল্প। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি শুধু পকেটে চাপ ফেলছে না; মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মানেও আঘাত করছে।
আয় ও বাজারদরের অসামঞ্জস্য
এই সংকটের মূলে রয়েছে আয় ও বাজারদরের অসামঞ্জস্য। পণ্যের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, উৎপাদন খরচ কিংবা সরবরাহের সংকটের কথা বলেন। এসব কারণ বাস্তব হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির দায় কি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই পড়বে? উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের ব্যয় যাচাই না করলে প্রকৃত সংকট আর অজুহাতের পার্থক্য বোঝা কঠিন। কৃষক ন্যায্য দাম না পেলেও ভোক্তাকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে মধ্যবর্তী সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে।
কৃষিপণ্যের বাজারে উৎপাদক ও ভোক্তার দামের ব্যবধান এ প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কৃষক মাঠে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, আর শহরের ভোক্তা সেই পণ্য কত দামে কিনছেন দুটো হিসাব পাশাপাশি রাখতে হবে। পরিবহন, সংরক্ষণ, শ্রম ও মধ্যবর্তী ব্যবসার যৌক্তিক ব্যয় রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বাইরে অস্বাভাবিক মুনাফা, কৃত্রিম সংকট কিংবা সমন্বিতভাবে দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকলে দায় নির্ধারণ করতে হবে। ব্যবসা ও মুনাফা বাজারের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু ভোক্তার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
বাজার তদারকি ও জবাবদিহি
বাজার তদারকির ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন রয়েছে। কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে অভিযান, জরিমানা কিংবা সতর্কবার্তার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পর বাজার কতটা স্থিতিশীল হলো, একই ব্যবসায়ী আবার অনিয়ম করলেন কি না কিংবা ভোক্তার ব্যয় কমল কি না তার ধারাবাহিক মূল্যায়ন জরুরি। বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাজারশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রয়োজন নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, মূল্যবৃদ্ধির কারণ যাচাই, মজুত ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা।
সরকারের দায়িত্ব কেবল বাজারে গিয়ে জরিমানা আদায় করা নয়, বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে। কৃষিপণ্যের মৌসুমভিত্তিক পূর্বাভাস, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় হ্রাস, পাইকারি ও খুচরা বাজারের তথ্য প্রকাশ এবং সরবরাহের দুর্বলতা চিহ্নিত করা জরুরি। কোন পণ্যের দাম কেন বাড়ছে, উৎপাদক কত পাচ্ছেন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের ব্যবধান কত এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা গেলে অস্বচ্ছতা কমবে। বাজারের তথ্য যদি শুধু ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হাতে থাকে, তাহলে সাধারণ ভোক্তা ন্যায্য দাম যাচাই করবেন কীভাবে?
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় কার্যকর করতে হবে। বাজারদর নিয়মিত প্রকাশ, অভিযোগ গ্রহণের সহজ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো জরুরি। কোথাও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রমাণিত কারসাজির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার উৎপাদন বা পরিবহন ব্যয় যৌক্তিকভাবে বাড়লে সেই বাস্তবতাও স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে। নির্বিচার অভিযান নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক বাজার ব্যবস্থাপনা।
ভোক্তার সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
শুধু বাজার তদারকি দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। সরকারি বিপণন কার্যক্রমের পণ্য যেন প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তালিকাভুক্তির অনিয়ম, পণ্য না পাওয়া কিংবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রানির মতো সমস্যাও দূর করতে হবে। সহায়তা এমন হতে হবে, যাতে মানুষ নিয়মিত প্রয়োজন মেটাতে পারেন; সংকট তীব্র হওয়ার পর সাময়িক উদ্যোগ নিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
ভোক্তার সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যতালিকা যাচাই, রসিদ সংগ্রহ, প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগ করা এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে বাজারদর জানার অভ্যাস অনিয়ম শনাক্ত করতে সহায়তা করে। তবে সব দায় ভোক্তার ওপর চাপানো অন্যায়। সীমিত আয়ের মানুষ প্রতিটি দোকান ঘুরে দাম যাচাই করার সময় ও সুযোগ সব সময় পান না। তাই সচেতন ভোক্তার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী, সক্রিয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাজারে পণ্য থাকা স্বস্তির একটি শর্ত, কিন্তু চূড়ান্ত সমাধান নয়। মানুষের আয় প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে এবং দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ থাকলে পণ্যের প্রাচুর্যও স্বস্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু বাজারে কত পণ্য এসেছে, তা দিয়ে মাপা যায় না; দেখতে হবে সাধারণ মানুষ কতটা সামর্থ্যের মধ্যে সেসব কিনতে পারছেন।
বাজারের প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে তখনই, যখন পণ্যের সরবরাহের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সামঞ্জস্য থাকবে, ন্যায্য মুনাফার পাশাপাশি ভোক্তার অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং বাজারের প্রতিটি স্তর জবাবদিহির আওতায় আসবে। মানুষের থলে ভরার সামর্থ্য ফিরিয়ে আনতে না পারলে বাজারের তাক ভরা থাকার দৃশ্য কেবল প্রাচুর্যের ছবি হয়েই থাকবে, স্বস্তির নয়।