বরফগলা উত্তর মেরু ও নতুন ভূরাজনীতি

আফরিদা ইসলাম:
পৃথিবীর মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। আমরা অনেক আগে থেকেই মানচিত্রে উত্তরের সাদা অংশটুকুকে বরফের দেশ হিসেবে জানতাম। সেখানে এখন নীল পানি দেখা দিচ্ছে এবং সেই নীল পানি জন্ম দিচ্ছে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে আর্কটিকের সমুদ্রের বরফ রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তথ্যমতে, গত চল্লিশ বছরে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় চার গুণ দ্রুত বেড়েছে।
এর ফলে উত্তর পূর্ব পথ বা নর্দান সি রুট (এনএসআর) এখন গ্রীষ্মকালেও প্রায় চার মাস খোলা থাকে। এই রুট খুলে যাওয়ার অর্থ হলো এশিয়া থেকে ইউরোপের দূরত্ব প্রায় তিন হাজার নটিক্যাল মাইল বা ৪০ শতাংশ কমে যাওয়া। আগে সিঙ্গাপুর থেকে হামবুর্গ যেতে সুয়েজ খাল হয়ে পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ দিন সময় লাগত। এখন তা কমে আঠারো থেকে বিশ দিনে নেমে এসেছে। এতে সময় বাঁচানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই লাভের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর ভূরাজনৈতিক খেলা।
লোহিত সাগরের সংকট ও চীনের বরফের রেশম পথ
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে লোহিত সাগর এবং বাব এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আগে এই পথে প্রতিদিন গড়ে সত্তরটি জাহাজ চললেও তা এখন ত্রিশটিতে নেমে এসেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের ১২ শতাংশ বহনকারী এই পথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় বাড়ছে দশ থেকে পনেরো দিন এবং ভাড়া বাড়ছে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
এই সংকটকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে চীন। দেশটি বহু বছর ধরেই ‘আইস সিল্ক রোড’ বা বরফের রেশম পথ প্রকল্পের কথা বলে আসছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ইস্তাম্বুল ব্রিজ’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজ প্রথমবারের মতো চীনের নিংবো থেকে ইউরোপের ফেলিক্সস্টো, হামবুর্গ এবং গদানস্ক পর্যন্ত সরাসরি আর্কটিক পথে যাত্রা সম্পন্ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট চীনের সি লিজেন্ড কোম্পানি ‘দুবাই টাওয়ার’ জাহাজ দিয়ে চীন ও ইউরোপের মধ্যে ‘আর্কটিক এক্সপ্রেস’ নামে প্রথম সাপ্তাহিক নিয়মিত সার্ভিস চালু করেছে। গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে এই পথে আটটি যাত্রার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয় এটিকে আন্তঃসীমান্ত ই কমার্স এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বিশ্বের প্রথম আর্কটিক রুট বলে অভিহিত করেছে।
এই রুটে এখন রাশিয়ার রোসাটম সমর্থিত অরোরা লাইন এবং হাইজি শিপিংও নিয়মিত চলাচল করছে। শুধু চীন বা রাশিয়া নয়, দক্ষিণ কোরিয়া গত আগস্টে বুসান বন্দর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে একটি জাহাজ এই পথে ইউরোপে পাঠিয়েছে। ভারতও ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৭ সালে তারা চেন্নাই থেকে ভ্লাদিভোস্তক হয়ে এনএসআর দিয়ে প্রথম পরীক্ষামূলক জাহাজ পাঠাবে। ২০২৫ সালে এই পথে মোট ১০৩টি ট্রানজিট যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও খনিজ সম্পদের লড়াই
প্রশ্ন হলো, নতুন এই বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে? সহজ উত্তর, রাশিয়ার হাতে। কারণ আর্কটিকের পুরু বরফ ভাঙতে পারমাণবিক আইসব্রেকার বা বরফভাঙা জাহাজ লাগে এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আইসব্রেকার বহর রয়েছে রাশিয়ার কাছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এনএসআরের বড় অংশ রাশিয়ার জলসীমা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তাই রুটটি ব্যবহারে রাশিয়ার নির্ধারিত নিয়ম ও অনুমতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যপথের পাশাপাশি এখানে শুরু হয়েছে সম্পদের লড়াই। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত তেলের প্রায় ১৩ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ আর্কটিকের বরফের নিচে লুকিয়ে আছে। এর সঙ্গে রয়েছে নিকেল, কোবাল্ট, প্লাটিনাম, লিথিয়াম এবং বিরল খনিজ উপাদান। এসব খনিজ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর এবং আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি প্রায় অচল।
এই বিপুল সম্পদের দখল নিতেই ২০২৬ সালে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই আর্কটিকে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ন্যাটো আর্কটিকে নতুন করে মহড়া শুরু করেছে, অন্যদিকে রাশিয়া তার উত্তরাঞ্চলীয় নৌঘাঁটিগুলো আধুনিকীকরণ করেছে। চীন নিজেকে ‘নিয়ার আর্কটিক স্টেট’ বা আর্কটিকের নিকটবর্তী রাষ্ট্র বলে দাবি করছে। ডেনমার্ক, কানাডা ও নরওয়ে সবাই মহাদেশীয় সোপানের দাবি নিয়ে জাতিসংঘে আবেদন জমা দিয়েছে। অর্থাৎ একদিকে বরফ গলছে, অন্যদিকে সীমানা নিয়ে টানাটানি বাড়ছে।
আর্কটিক প্যারাডক্স ও পরিবেশগত ঝুঁকি
বাণিজ্য ও সামরিক উল্লাসের মাঝে পরিবেশবাদীরা এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘আর্কটিক প্যারাডক্স’। বরফ গলছে বলেই সেখানে জাহাজ চলছে, আবার জাহাজ চলছে বলেই কালো কার্বন এবং গ্রিনহাউস গ্যাস বরফের ওপর জমছে এবং বরফকে আরও দ্রুত গলিয়ে দিচ্ছে। বড় জাহাজের প্রচণ্ড শব্দে তিমি এবং সিলের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া সেখানে দুর্ঘটনাবশত তেল ছড়িয়ে পড়লে তা পরিষ্কার করার মতো কোনো কার্যকর প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এই ঝুঁকির কারণে বিশ্বের চারটি বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি এমএসসি, সিএমএ সিজিএম, হাপাগ লয়েড এবং মায়ের্সক প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে আর্থিক লাভের সুযোগ থাকলেও তারা আর্কটিক রুট ব্যবহার করবে না।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই পরিবর্তনের প্রভাব দ্বিমুখী। একদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের দূরত্ব কমলে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সময় কম লাগবে। কিন্তু অন্যদিকে সুয়েজ খালের গুরুত্ব কমে গেলে কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের মতো ট্রান্সশিপমেন্ট হাবগুলোর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বদলে যাবে। তখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে নির্ধারিত হবে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আর্কটিক আমাদের চোখে দূরের বরফের দেশ মনে হলেও এর বরফ গলে যাওয়া আমাদের উপকূলের জন্য সরাসরি হুমকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশের মতো নিচু দেশগুলোই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই উত্তর মেরুর এই অলিখিত লড়াই কেবল বাণিজ্যপথ বা তেল ও গ্যাস দখলের লড়াই নয়। এটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তার লড়াই, যেখানে প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং সামরিক শক্তি একাকার হয়ে গেছে। এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে তারাই, যারা বরফ পুরোপুরি গলে যাওয়ার আগেই সঠিক ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।