সংকুচিত রাজপথ, বন্দি পদচিহ্ন

নিশাত স্নেহা:
ইটের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নীল আকাশের পানে চেয়ে এই শহরের রাজপথে আজ কেবলই এক তীব্র হাঁসফাঁস সুর বাজে। কোলাহলময় এ নগরে স্বাধীনভাবে দুটো পা ফেলে হেঁটে যাওয়ার অধিকারটুকু হঠাৎ করেই যেন পিচঢালা রাস্তার কঠিন সীমানায় বন্দি হয়ে পড়ে। পথচারীদের ক্লান্ত চোখের কোণে জমতে থাকে নিত্যদিনের না বলা বিরক্তি ও নীরব কষ্টের কত হিসাব।
জীবনের প্রয়োজনে কিংবা দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় প্রতিদিন এই শহরের, বিশেষ করে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার কিংবা আশপাশের পুরোনো গলিগুলোতে পা রেখেই থমকে যেতে হয় নির্মম বাস্তবতার মুখে। যেখানে ফুটপাত দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে পথ চলা যেন এক অবাস্তব স্বপ্ন, আর হকারদের দখলদারিত্বে রাস্তা অর্ধেক হয়ে যাওয়া এক নিত্যসংগ্রাম। নবাগত কিংবা পুরোনো সব বাসিন্দার এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চারদিকে যেন জমে উঠেছে রাজপথ দখলের নির্দয় উৎসব। যে ফুটপাত ছিল পথচারীর নিরাপদ আশ্রয়, তা আজ পরিণত হয়েছে অস্থায়ী বাজারের পসরা মেলানোর খোলা মঞ্চে। হাঁটার জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে মূল রাস্তায় নামতে হয় সাধারণ মানুষকে, আর অমনি পেছন থেকে ধেয়ে আসে যানবাহনের হর্ন। এর ওপর কোণঠাসা পথচারীর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো যোগ হয় ফুটপাতের ওপর উঠে পড়া একশ্রেণির বেপরোয়া মোটরসাইকেল।
যেন ফুটপাত আর রাস্তা কোনোটিই মানুষের নিরাপদে পা ফেলার যোগ্য নয়। দিনশেষে এই নগরী পথচারীর স্বাভাবিক গতিটুকুও যেন নির্মমভাবে কেড়ে নেয়। একদিকে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ির যন্ত্রণাদায়ক ধীরগতি, অন্যদিকে ফুটপাত দখলের ফলে উপচে পড়া ভিড়, এই দুটির মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক স্থবির যানজট। এ যেন এক অচলাবস্থায় আটকে থাকা বন্দি জীবন।
বাস্তবতা হলো, অভিযান যতবারই হোক, সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে ফুটপাত আবারও দখল হয়ে যায়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ পার্কিং, ভাসমান দোকান, রাস্তার ওপর মালামাল ওঠানো নামানো এবং ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হলেও উচ্ছেদের পর আবারও দখল ফিরে আসার অভিযোগ রয়েছে। বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে লক্ষ্মীবাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে অস্থায়ী দোকান বসার কারণে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক দিয়ে চলাচলের বিষয়টিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ও নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, নিয়মিত তদারকি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরের দাবি খুব বেশি বড় কিছু নয়। রাজপথ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। কেবল সাময়িক উচ্ছেদ নয়, ফুটপাতের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ভারী জরিমানা, কঠোর বিচারব্যবস্থা এবং আইনি তদারকি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও মানবিক পুনর্বাসননীতি প্রণয়ন এবং ফুটপাত দখলের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
কারণ ফুটপাত কেবল ইট পাথরের তৈরি কোনো পরিত্যক্ত জায়গা নয়, এটি একজন পথচারীর চলার অধিকার, নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদার অংশ। শত প্রতিকূলতা, ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও নগরবাসীর বুকে আগলে রাখা এক চিলতে আশা কিন্তু মরে যায় না। তারা বিশ্বাস করতে চায়, সব বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে একদিন হয়তো এই শহরের রাজপথও প্রাণ ফিরে পাবে, আর পথচারী ফিরে পাবে তার অবাধে হেঁটে চলার অধিকার ও মানবিক এক নতুন ভোর।