শিক্ষকের মর্যাদা ও উপযুক্ত বেতন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি

সমাজের সর্বস্তরে শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত। যুগে যুগে শিক্ষকের হাত ধরেই সমাজ পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায়। একটি জাতির মেধা, মনন ও নৈতিকতার ভিত গড়ে ওঠে শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে। দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তাঁদের ভূমিকা সবার ওপরে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই মহান পেশাকে নিজেদের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে।
এই অনাগ্রহের পেছনে প্রধান কারণ হলো আমাদের দেশের শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতনকাঠামো। দীর্ঘ অধ্যবসায় ও উচ্চশিক্ষা শেষে একজন তরুণের স্বপ্ন থাকে এমন একটি পেশায় যুক্ত হওয়া, যা তাঁকে সমাজে সম্মানজনক ও আর্থিকভাবে সচ্ছল জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেবে। বর্তমানের আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ভার মেটানোর জন্য কেবল সামাজিক সম্মানই যথেষ্ট নয়। শিক্ষকদের বেতনকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য প্রথম শ্রেণির পেশার তুলনায় এতটাই কম যে, অনেকেই বাধ্য হয়ে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হচ্ছে, তা হলো মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন দেখেন শিক্ষকতায় তাঁর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই, তখন তিনি অন্য কোনো লাভজনক সরকারি বা করপোরেট চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়েন। মেধার এই অবমূল্যায়ন সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত। মেধাবীরা যদি শিক্ষাদান থেকে দূরে সরে যান এবং শ্রেণিকক্ষে যদি যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব দেখা দেয়, তবে সমাজে এক অন্ধ ও অদক্ষ প্রজন্ম তৈরি হবে। গুণগত শিক্ষার অভাবে ব্যাহত হবে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন।
জ্ঞানের আলো ছড়াতে হলে প্রদীপের নিজেরও তো টিকে থাকার মতো রসদ প্রয়োজন। তাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো শিক্ষকদের শুধু কথায় নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি তাঁদের জন্য একটি যুগোপযোগী, আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক বেতনকাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি। রাষ্ট্রকে উপলব্ধি করতে হবে যে, শিক্ষকের জীবনমানের উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই আলোকিত হবে না।