প্রবীণদের নীরব কান্না ও যৌথ পরিবারের অবসান

নাগরিক জীবনে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই একটি চেনা দৃশ্য চোখে পড়ে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নিচের ব্যস্ত সড়কের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন একজন বৃদ্ধ মানুষ। নিচে গাড়ি ছুটছে, মানুষ ছুটছে, জীবন চলছে দুর্বার গতিতে। শুধু সেই ব্যালকনিতে সময় যেন জমে বরফ হয়ে আছে। এটি কেবল একজন মানুষের একাকী দাঁড়িয়ে থাকার ছবি নয়, এটি আধুনিক নগরায়ণ ও নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে নিঃশব্দে একঘরে হয়ে পড়া এক প্রবীণ প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি।
আমাদের সমাজে একসময় পরিবার মানেই ছিল সম্পর্কের এক বড় বৃক্ষ। দাদা-দাদি, চাচা-ফুফু, ভাই-বোন মিলে এক উঠোনে বা একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা। সেই যৌথ পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠরা ছিলেন পরিবারের বটগাছ। তাদের পরামর্শে সংসার চলত, তাদের অভিজ্ঞতার মূল্য ছিল, আর দিনশেষে নাতি-নাতনিদের কোলাহলে তাদের বার্ধক্য কাটত সজীবতায়।
তবে সময়ের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণায় সেই যৌথ পরিবারের কাঠামো আজ ভেঙে চুরমার। গড়ে উঠেছে ‘স্বামী-স্ত্রী-সন্তান’ নির্ভর একক পরিবার বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। নগরজীবনের ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্টে অতিরিক্ত মানুষের জায়গা কম, আর তার চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়েছে মানসিক পরিসরে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য চুকোতে হচ্ছে আমাদের প্রবীণ মা-বাবাকে।
একক পরিবারের ব্যস্ততার সমীকরণটি বেশ স্পষ্ট। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই কর্মক্ষেত্রের তাড়া, সন্তানের স্কুল-কোচিংয়ের চাপ। সারাদিনের পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে সবাই ব্যস্ত নিজের ফোন বা ল্যাপটপের ভার্চুয়াল জগতে। এই হিসাব-নিকাশের ছকে পরিবারের বয়স্ক মানুষটির কথা বলার মতো কোনো জায়গা থাকে না। তার ওষুধ হয়তো সময়মতো আসছে, খাওয়ার থালা হয়তো যথাসময়ে টেবিলে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে তার সাথে দুটো কথা বলার মানুষ। নিঃসঙ্গতা তখন আর কোনো মানসিক বিলাসিতা থাকে না, তা পরিণত হয় ধীরে ধীরে গ্রাস করা এক অদৃশ্য ব্যাধিতে।
শারীরিক বার্ধক্যের চেয়ে মানসিক এই উপেক্ষা মানুষকে অনেক দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। যে মানুষটি সারাজীবন পরিবার ও সমাজের কেন্দ্রে থেকে সিদ্ধান্ত নিতেন, হুট করেই নিজেকে অপ্রয়োজনীয় আবিষ্কার করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনেকে সন্তানদের সংসারে ‘বোঝা’ বা ‘অতিথি’র মতো অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকেন। কেউ কেউ আবার গ্রামে একা ভিটে আঁকড়ে পড়ে থাকেন, যেখানে উৎসব-পার্বণেও সন্তানদের দেখা মেলে হয়তো বছরে এক-আধবার। এমনকি বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধিও আমাদের এই ভাঙনের সামাজিক রূপটি নগ্নভাবে সামনে আনছে।
আমরা অর্থনৈতিকভাবে এগোচ্ছি, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু সামাজিক পুঁজির জায়গায় আমরা কি ক্রমশ দেউলিয়া হয়ে পড়ছি না? একটি সমাজের মানবিক পরিপক্বতা পরিমাপ করা হয় তারা শিশু ও বৃদ্ধদের কেমন রাখছে তা দেখে। প্রবীণদের এই নীরব নির্বাসন প্রমাণ করে, আধুনিকতার পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা আমাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল শিকড়টি কেটে ফেলছি।
সমাধান কিন্তু খুব কঠিন কোনো তত্ত্বে নেই। যৌথ পরিবারের পুরনো কাঠামো হুবহু ফিরিয়ে আনা হয়তো আজকের বাস্তবতায় সবার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু যৌথ অনুভূতিটুকু তো আমরা ধরে রাখতে পারি। দিনশেষে অন্তত পনেরো মিনিট তাদের পাশে বসে তাদের পুরনো দিনের গল্প শোনা, তাদের মতামতকে সংসারে গুরুত্ব দেওয়া এবং ছুটির দিনে তাদের জন্য একটু আলাদা সময় বরাদ্দ রাখা খুব বড় কোনো ত্যাগ নয়।
আজ যাদের বার্ধক্যকে আমরা অবহেলা করছি, মনে রাখা প্রয়োজন, সময়ের নিয়মে কাল আমরাও সেই একই বয়সের মুখোমুখি হব। বৃদ্ধ বয়সে ভালোবাসা আর সঙ্গ পাওয়া কোনো করুণা নয়, এটি তাদের আজীবনের শ্রমের প্রাপ্য অধিকার। পরিবারকে কেবল থাকার জায়গা নয়, প্রকৃত অর্থেই আশ্রয়ের ঠিকানা বানিয়ে রাখতে হবে, যেন কোনো বৃদ্ধ চোখে বারান্দার গ্রিল আজীবন বন্দিত্বের প্রতীক না হয়ে ওঠে।
ডিএ/