বহমান গনেশ্বরী আর থমকে যাওয়া জীবন

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রানীগাঁও এলাকায় গনেশ্বরী নদীর উপর নির্মিত কাঠ-বাশেঁর সেতুতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করছেন। পারাপারের সময় প্রতিটি পদক্ষেপে তৈরি হচ্ছে চরম আতঙ্ক।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী খারনৈ ইউনিয়নের রাণীগাঁও ও নলছাপড়া গ্রামকে পৃথক করে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী গনেশ্বরী। সারা বছর কম-বেশি পানি থাকলেও বর্ষায় এটি রূপ নেয় খরস্রোতা নদীতে। উত্তর পাড়ের ১০টি গ্রামের প্রায় ১৪ হাজার মানুষকে প্রতিদিন প্রশাসনিক ও চিকিৎসার প্রয়োজনে উপজেলা সদরে আসতে হয়। আর দক্ষিণ পাড়ের আরও ১০–১৫টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে ফসল উৎপাদন ও অন্যান্য প্রয়োজনে উত্তর পাড়ে যেতে হয়।
দক্ষিণ পাড়ে দুইটি উচ্চ বিদ্যালয়, চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল ও দুইটি মাদ্রাসা অবস্থিত। উত্তর পাড়ের শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গনেশ্বরী পার হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসতে হয়। নদীর অববাহিকায় হওয়ায় অঞ্চলটি কৃষি ও ফসলের জন্য অত্যন্ত উর্বর। ধান, গম, ভুট্টা, আলু ও নানান শাকসবজি উৎপাদনে এলাকাটির বিশেষ পরিচিতি থাকলেও যোগাযোগের ভঙ্গুর পরিস্থিতির কারণে কৃষকেরা সঠিক মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারেন না।
গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও জটিল রোগীদের জন্য গনেশ্বরী নদী এক আতঙ্কের নাম। টেকসই সেতু না থাকায় অনেক সময় সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি লাঘবে কলমাকান্দা-দুর্গাপুর আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নিজস্ব অর্থায়নে একটি কাঠ-বাঁশের সেতু নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে পচন ধরে এবং অনেক স্থানে খুঁটি ভেঙে সেতুটি বিপজ্জনক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন, নদীর প্রশস্ততা বেশি হওয়ায় স্থানীয়দের পক্ষেও নিজস্ব অর্থায়নে স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি দূর করতে গনেশ্বরী নদীর ওপর একটি পাকা ও স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। টেকসই সমাধানের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য:
১. জরুরি সংস্কার ও বিকল্প ব্যবস্থা: বর্ষা মৌসুমে দুর্ঘটনা এড়াতে জরাজীর্ণ সাঁকোটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও মুমূর্ষু রোগীদের পারাপারের জন্য সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ নৌ-সেবা চালু করা দরকার।
২. পাকা গার্ডার সেতু অনুমোদন: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) বা সড়ক ও জনপথ বিভাগের (RHD) অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত ‘পাকা গার্ডার সেতু’ নির্মাণের বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পাকা সংযোগ সড়ক নির্মাণ: কেবল সেতু নির্মাণ করলেই হবে না; উত্তর ও দক্ষিণ পারের গ্রামীণ রাস্তাগুলোকে সেতুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাকা সংযোগ সড়কে রূপান্তর করতে হবে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে।
গনেশ্বরী নদীর ওপর একটি পাকা সেতু কেবল ইট-পাথরের কোনো সাধারণ কাঠামো হবে না; এটি হবে সীমান্তবর্তী এই অবহেলিত জনপদের হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য বদলের সেতু। এই সেতু নির্মিত হলে অঞ্চলের কৃষকেরা তাদের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন, শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এবং কোনো গর্ভবতী নারী বা জটিল রোগীকে বিনা চিকিৎসায় পথিমধ্যে প্রাণ হারানোর আশঙ্কায় থাকতে হবে না। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত সদিচ্ছাই পারে এই দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের অবসান ঘটাতে।
লেখক পরিচিতি: আনোয়ার হোসেন, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।