বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

জলবায়ু উদ্বাস্তু: ভবিষ্যতের বড় হুমকি ও মানবিক সংকট

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
প্রকৃতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে সেই প্রকৃতিই যেন মানুষের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একসময় যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা দারিদ্র্য মানুষকে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য করত। কিন্তু আজ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা—জলবায়ু পরিবর্তন। নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততার বিস্তার এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জলবায়ু উদ্বাস্তু তৈরি করছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এ সংকটের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, নদীভাঙন ও উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে।একটি দুর্যোগের ক্ষত শুকানোর আগেই আরেকটি দুর্যোগ মানুষের জীবনকে নতুন করে বিপর্যস্ত করে তুলছে । হাজারো পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে শহরের বস্তিতে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে।তারা হারাচ্ছে শুধু একটি বাড়ি নয়; হারাচ্ছে জীবিকা, শিক্ষা, সামাজিক পরিচয়, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সংকট কেবল আশ্রয়ের সংকট নয়, এটি একটি গভীর মানবিক সংকট। শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ার ফলে নগরজীবনের ওপর চাপ বাড়ছে, কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা আরও সীমিত হয়ে পড়ছে। অনেক শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে শ্রমবাজারে নামতে বাধ্য হচ্ছে, অনেক পরিবার দারিদ্র্যের চক্রে আটকে যাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
এই সংকটের জন্য একমাত্র প্রকৃতিকে দায়ী করলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড। নির্বিচারে বন উজাড়, নদী দখল, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণ প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফল ভোগ করছে বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো। ফলে জলবায়ু উদ্বাস্তু সৃষ্টি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়;এটি মানবসৃষ্ট পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক বৈষম্যেরও এক কঠিন পরিণতি।
এই সংকট মোকাবিলায় সাময়িক নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বাঁধ ও দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নদীভাঙনপ্রবণ মানুষের পরিকল্পিত পুনর্বাসন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষির সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু অভিযোজন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত দেশগুলোর ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
আজ যদি আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ শুধু আরও বেশি বন্যা, নদীভাঙন কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হবে না; বরং লাখো মানুষ তাদের জন্মভূমি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আমরা আজ যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী প্রজন্ম একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ পাবে।আজকের উদাসীনতা যদি আগামী দিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়, তবে জলবায়ু উদ্বাস্তু শুধু একটি শব্দ থাকবে না; এটি হবে কোটি মানুষের পরিচয়।তাই এখনই সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যা মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
কামনা মিম, শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।