শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

বইয়ের পাতায় চোখ ফেরাতে হবে জেনজি প্রজন্মকে

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
“বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না” – বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর এই অমর উক্তি একদিন আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ ছিল। একসময় বই ছিল জ্ঞানের মূল ভাণ্ডার এবং বিনোদনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘চোখের বালি’, ‘শেষের কবিতা’ কিংবা নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ পড়ে এক প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল। কিন্তু আজকের আধুনিক প্রযুক্তি ও স্ক্রিননির্ভরতার যুগে সেই গভীর পড়ার অভ্যাস আমরা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক—বই পড়ার অভ্যাস কমার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছেন, যার একটি বিশাল অংশ তরুণ প্রজন্ম। তরুণরা দিনের বেশিরভাগ সময় নিউজফিড স্ক্রল করা, রিলস দেখা কিংবা লাইক-কমেন্টেই ব্যয় করছে। ৩০ সেকেন্ডের একটি রিলস বা সংক্ষিপ্ত ভিডিও আমাদের তাৎক্ষণিক বিনোদন দেয় সত্য, কিন্তু ৩০০ পৃষ্ঠার একটি বই শেষ করতে যে ধৈর্য ও একাগ্রতা প্রয়োজন, তা ডিজিটাল মনোযোগের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলোতেও সপ্তাহে মানুষের বই পড়ার সময় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে এবং শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ স্বীকার করে যে সামাজিক মাধ্যমের আসক্তির কারণে তারা নিয়মিত বই পড়ার ফুরসত পাচ্ছে না।
এই সামাজিক মাধ্যম ও স্ক্রিন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বারবার নোটিফিকেশন চেক করার অভ্যাস মানুষের মনোযোগের ব্যাপ্তি বা অ্যাটেনশন স্প্যান মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে কোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট ছোট ক্যাপশন ও সংক্ষিপ্ত পোস্টে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার কারণে দীর্ঘ প্রবন্ধ বা মানসম্পন্ন সাহিত্য পড়ার আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক মাধ্যম আমাদের বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্য দিতে পারে, কিন্তু গভীর চিন্তা, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও নতুন কল্পনাশক্তি তৈরি করতে পারে না। ফলে তরুণ সমাজের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে না এবং সামগ্রিক লেখার মান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
অথচ একটি সমৃদ্ধ ও সংবেদনশীল সমাজ গঠনে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষের অর্থনীতি, ইতিহাস, ভূগোল, নীতি ও সাহিত্যের দুয়ার খুলে দেয়। রবীন্দ্র-নজরুলসহ কালজয়ী লেখকদের সাহিত্য আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও চেতনার শিকড়ের সাথে যুক্ত করে। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মানুষের মানসিক উৎকর্ষ ও মানবিক গুণাবলি বিকশিত করে। একটি ভালো বই পাঠককে আত্মোপলব্ধির সুযোগ দেয় এবং নতুন করে ভাবতে শেখায়, যা কখনোই কোনো সংক্ষিপ্ত সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাস বা রিলসের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়।
হারিয়ে যাওয়া এই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়—অন্তত ৩০ মিনিট—মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইস দূরে রেখে বই পড়ার জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। দীর্ঘ বা জটিল বই দিয়ে শুরু না করে নিজের পছন্দের ছোট গল্প, কবিতা বা প্রিয় লেখকের লেখা দিয়ে পড়া শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পাশাপাশি বন্ধু ও সহপাঠীদের সাথে পাঠচক্র গঠন বা রিডিং চ্যালেঞ্জের আয়োজন পড়ার গতি বাড়াতে সাহায্য করে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও শিক্ষার্থীদের বই উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা এবং শিক্ষকদের ক্লাসে বই পড়তে উৎসাহিত করা জরুরি।
প্রযুক্তি নিজে ক্ষতিকর নয়, বরং এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই আজ আমাদের বইবিমুখ করে তুলছে। আমরা যদি আবার বইকে আসল বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি এবং রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্যের কাছে ফিরে যাই, তবেই আমাদের মন ও জাতির ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ হবে। কারণ বই কেবল কতগুলো মুদ্রিত কাগজের স্তূপ নয়—বই হলো একটি জীবন্ত জাতির আত্মা।
তাসরিফা পুষ্পিতা রোশনি, সদস্য, তরুণ কলাম লেখক সংঘ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়