মালিটোলার রাস্তা: চলাচলের পথ নাকি অস্থায়ী শৌচাগার?

রাজধানী ঢাকার পুরোনো অংশ এর ঐতিহ্য, ব্যস্ততা ও জনবহুলতার জন্য সমধিক পরিচিত। প্রতিদিন হাজারো মানুষ নানা প্রয়োজনে পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু এই ব্যস্ত নগরজীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন কিছু দৃশ্যপট, যা কেবল পরিবেশের সৌন্দর্যই নষ্ট করছে না, বরং আমাদের নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে।
পুরান ঢাকার মালিটোলার একটি ব্যস্ত সড়কের চিত্র আমাদের নগরজীবনের এক চরম অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। মানুষের চলাচলের জন্য নির্মিত রাস্তার একাংশ প্রতিদিনই যেন পরিণত হচ্ছে অস্থায়ী শৌচাগারে। রাস্তার পাশের দেয়াল ঘেঁষে নিয়মিত প্রস্রাব করার কারণে শুধু পরিবেশই নোংরা হচ্ছে না, সৃষ্টি হচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ ও মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই দেখা যায়, প্রকাশ্যে এই কাজ করছেন অনেকেই। আশপাশের স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশই বলে দেয়, এটি কোনো এক বা দুই দিনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
পুরান ঢাকা এমনিতেই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে সামান্য অপরিচ্ছন্নতাও দ্রুত বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। মালিটোলার এই রাস্তাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং জজ কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অসংখ্য মানুষের নিয়মিত চলাচলের পথ। রাস্তার কাছাকাছি থাকা খাবারের দোকান, ফলের ভ্যান ও সাধারণ পথচারীদের জন্য এই চিত্র অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও অস্বাস্থ্যকর। কতিপয় বিবেকহীন মানুষের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিদিন চরম অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
প্রশ্ন হলো—একজন মানুষ কেন প্রকাশ্যে রাস্তায় প্রস্রাব করবেন? এর পেছনে ব্যক্তিগত অসচেতনতা যেমন দায়ী, তেমনি অপর্যাপ্ত ও অব্যবস্থাপিত গণশৌচাগারের অভাবও একটি বড় কারণ। তবে নাগরিক সুবিধার ঘাটতি থাকলেও জনসম্মুখে এমন আচরণ কোনোভাবেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে না।
এ সমস্যার সমাধানে শুধু সাধারণ মানুষকে দোষারোপ করলেই চলবে না; সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন গণশৌচাগার স্থাপনে দ্রুত উদ্যোগী হতে হবে। যেসব স্থানে প্রকাশ্যে প্রস্রাবের প্রবণতা বেশি, সেখানে স্পষ্ট সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং প্রয়োজনে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায় রয়েছে। রাস্তা, দেয়াল কিংবা ফুটপাত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নিজের সামান্য সুবিধার জন্য একটি জনপরিসরকে নোংরা করার অধিকার কারও নেই। একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শহর শুধু কর্তৃপক্ষের একক উদ্যোগে গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকদের সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ।
আজ যে রাস্তায় আমরা নোংরা করছি, আগামীকাল সেই পথেই হয়তো আমাদের হাঁটতে হবে। তাই আসুন, একটু সচেতন হই। রাস্তা মানুষের চলাচলের পথ, এটি কোনো ব্যক্তিগত ওয়াশরুম নয়। আমাদের সামান্য একটু সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই পারে চারপাশের এই পরিবেশটা বদলে দিতে।
লেখক: মিফতাহুল জান্নাত মৌমিতা, শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।