শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

জলবায়ু সম্মেলনগুলো কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা?

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

প্রতি বছর বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধান, নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মীরা জলবায়ু সম্মেলনের একই মঞ্চে বসেন। দীর্ঘ আলোচনা হয়, উচ্চারিত হয় বড় বড় প্রতিশ্রুতি, গৃহীত হয় নানা ঘোষণা। কিন্তু সম্মেলনের আলো নিভে যাওয়ার পর যখন উপকূলের মানুষ জোয়ারের পানিতে ঘর হারায়, কৃষকের জমি খরায় ফেটে যায় কিংবা বন্যায় একটি শিশু তার বই-খাতা হারিয়ে ফেলে, তখন প্রশ্ন জাগে—জলবায়ু সম্মেলনগুলো কি সত্যিই পরিবর্তনের পথ দেখায়, নাকি সেগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সতর্কবার্তা নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অথচ এই সংকট সৃষ্টিতে আমাদের অবদান অত্যন্ত সামান্য। বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ খুবই কম, কিন্তু জলবায়ুর নির্মম অভিঘাত আমাদেরই বেশি সহ্য করতে হচ্ছে। উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, আর প্রতিবছর হাজারো মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

এই বাস্তবতা থেকেই বিশ্বের দেশগুলো নিয়মিত জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজন করে। এর উদ্দেশ্য—কার্বন নিঃসরণ কমানো, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা। শুনতে আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বছরের পর বছর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, নতুন নতুন ঘোষণা আসছে, কিন্তু জলবায়ু বিপর্যয়ের মাত্রা কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই আরও বাড়ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক—এই সম্মেলনগুলোর বাস্তব ফল কোথায়?

সমস্যার মূল কারণ প্রতিশ্রুতির অভাব নয়; অভাব তার বাস্তবায়নে। উন্নত দেশগুলো বহুবার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সেই সহায়তা প্রায়ই পর্যাপ্ত নয় কিংবা সময়মতো পৌঁছায় না। একইভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অনেক দেশ নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণে পিছিয়ে থাকে। ফলে সম্মেলনের ভাষণ যত আশাব্যঞ্জকই হোক, বাস্তবতার সঙ্গে তার ব্যবধান থেকেই যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে থাকা দেশগুলো তাই আজও ন্যায্য সহযোগিতার অপেক্ষায়।

তবে জলবায়ু সম্মেলনকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলাও ন্যায়সঙ্গত হবে না। এসব সম্মেলনের মাধ্যমেই জলবায়ু সংকট আজ বৈশ্বিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সম্মেলন সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমাধানের পথ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সেই পথ যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ না নেয়, তাহলে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।

জলবায়ু সংকট কেবল পরিবেশের সংকট নয়; এটি মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও। একটি নদী ভাঙলে শুধু জমি হারায় না, হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্মৃতি। একটি ঘূর্ণিঝড় শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, ভেঙে দেয় মানুষের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। একটি বন্যা শুধু রাস্তা ডুবিয়ে দেয় না, থামিয়ে দেয় হাজারো শিশুর শিক্ষাজীবন। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বাড়ছে, জীবিকা বদলে যাচ্ছে, দারিদ্র্য আরও গভীর হচ্ছে। তাই জলবায়ু নিয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে, শুধু পরিসংখ্যানকে নয়।

একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোরও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার প্রসার এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও কার্যকর পরিকল্পনা ও সুশাসনের বিকল্প নেই।

আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি নয়; প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ। কারণ প্রকৃতি অপেক্ষা করে না। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়তেই থাকে, বন উজাড় হতে থাকে, তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে। তাই একটি সম্মেলনের সাফল্য নির্ধারণ হবে কতটি ভাষণ দেওয়া হলো বা কতটি ঘোষণা প্রকাশিত হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কত মানুষের জীবন নিরাপদ হলো, কত পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা পেল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা গেল—সেই বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে।

তাই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক—জলবায়ু সম্মেলনগুলো কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা? উত্তরটি এখনো পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ নয়, আবার নিঃসন্দেহে ‘না’-ও নয়। কারণ সম্মেলনের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে ঘোষণাপত্রে নয়, তার বাস্তবায়নে। যেদিন প্রতিশ্রুতি সত্যিকারের পদক্ষেপে রূপ নেবে, সেদিনই জলবায়ু সম্মেলন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মঞ্চ নয়, মানবতার ভবিষ্যৎ রক্ষার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: কামনা মিম, শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ডিএ/