শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

পরিবহনের নতুন ধারা: রাজধানীতে নারীদের জন্য বিশেষ ‘পিঙ্ক বাস’

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

“সাম্যের গান গাই— আমার চোখে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।” বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী এই পঙ্‌ক্তি আজকের বাংলাদেশে এসে যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। রাজপথ আজ আর বিশেষ কারও একক দখলের জায়গা নয়—রাস্তা এখন সবার।
সড়কপথে আজ দুর্বার বাংলাদেশ। আর সেই দুর্বার যাত্রায় এক নতুন পালক যুক্ত করেছেন আমাদের নারী সমাজ। এতদিন ধরে যে রাজপথে তারা কেবলই এক একজন অসহায় কিংবা শঙ্কিত যাত্রী ছিলেন, আজ সেই পথের চালকের আসনেও তারা সমাসীন। তাদের হাত ধরেই মূলত পরিবহন খাতে রচিত হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।

র্মমুখর রাজধানী ঢাকা। প্রতিদিন ভোর হলেই হাজারো স্বপ্ন ঘর ছেড়ে বের হয়—স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণী আর কর্মজীবী নারী। কিন্তু তাদের ব্যাগে বই কিংবা প্রয়োজনীয় নথিপত্রের সাথে জড়িয়ে থাকতো এক অদৃশ্য ভয়: “বাসে উঠতে পারবো তো? নিরাপদে পৌঁছাতে পারবো তো?” গণপরিবহন সার্বজনীন হওয়ার কথা থাকলেও নারীদের জন্য তা এতদিন ছিল এক চরম দৈনন্দিন পরীক্ষা।

সেই পরীক্ষার দিনগুলোতে স্বস্তির হাওয়া নিয়ে এলো ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট। তেজগাঁওয়ের বিআরটিসি ঢাকা ট্রাক ডিপোতে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এক নতুন সেবার উদ্বোধন করেন—যার নাম ‘পিঙ্ক বাস’।

পিঙ্ক বাস কেবল একটি গোলাপি রঙের গাড়ি নয়, এটি একটি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এবং সম্মানের প্রতীক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই সার্ভিসের বিশেষত্ব হলো—এর চালক নারী, টিকিট সংগ্রাহক নারী এবং সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীও নারী।

এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করা। যে মেয়েটি ভিড় বা যৌন হয়রানির ভয়ে ক্লাস মিস করতে বাধ্য হতো, সে এখন আত্মবিশ্বাসের সাথে ক্লাসে যাচ্ছে। যে নারী সন্ধ্যার পরপরই কাজ শেষ করে ফেরার দুশ্চিন্তায় থাকতেন, তিনি এখন নির্ভয়ে রাতের শিফটেও কাজ করছেন।

উদ্যোগটির সূচনা ঢাকায়। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ১০টি রুটে চলছে এই সার্ভিস। তবে গোলাপি বাসের এই আলো কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়ছে জেলায় জেলায়। বগুড়ার শেরপুর থেকে মাটিডালি কিংবা চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা—সবখানেই এখন রাজপথ মাতাচ্ছে নারীদের চালিত এই বাস।

এই পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। যে খাতকে এতদিন পুরুষের একচেটিয়া কর্মক্ষেত্র ভাবা হতো, তার স্টিয়ারিং এখন নারীর হাতে। একজন নারী যখন ৪০ জন যাত্রী নিয়ে সগৌরবে বাস চালান, তখন তিনি কেবল তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেন না; বরং পৌঁছে দেন এক বুক সাহস। তিনি প্রমাণ করে দেন—মেয়েরাও পারে। এটি সরাসরি নারী ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বিতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
কল্পনা করুন সেই দৃশ্যটি—স্ট্যান্ডে এসে থামলো একটি গোলাপি বাস, দরজা খুলে দিলেন একজন নারী কন্ডাক্টর, আর চালকের আসনে বসে আছেন আরেক নারী। ভেতরে নিশ্চিত মনে বসে আছেন শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, ব্যাংকার ও পোশাকশ্রমিকেরা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো কিশোরী যখন এই দৃশ্য দেখে, তার মনেও বড় হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন স্বপ্ন দানা বাঁধে।

তবে এই স্বপ্নকে স্থায়ী করতে হলে কাজের পরিধি আরও বাড়াতে হবে। ১০টি রুট দিয়ে বিশাল ঢাকার চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন আরও বাস, নতুন রুট, সময়ানুবর্তিতা এবং বাসের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। পিঙ্ক বাস যেন কেবল সাময়িক কোনো প্রকল্প না হয়; এটি যেন হয় এক টেকসই বিপ্লবের সূচনা।

জাতীয় কবি সাম্যের যে গান গেয়ে গেছেন, পিঙ্ক বাস সেই বৈষম্যহীন সমাজ গড়ারই প্রথম ধাপ। রাষ্ট্র ও সমাজ চাইলে যে পরিবর্তন সম্ভব, এটি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে এমন এক বাংলাদেশ—যেখানে আলাদা করে ‘পিঙ্ক বাস’ চালু করার প্রয়োজন পড়বে না; বরং দেশের প্রতিটি গণপরিবহন ও প্রতিটি রাজপথ প্রতিটি নারীর জন্য হবে সমান নিরাপদ। সেদিনই কাজী নজরুলের সাম্যের গান পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।

লেখক: তাসরিফা পুষ্পিতা রোশনি, 
সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণ লেখক সংঘ
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়