বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

শিক্ষার রূপান্তর: অতীত থেকে ভবিষ্যৎ

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

শিক্ষা কোনো স্থির জলাশয় নয়, এটি একটি প্রবহমান নদী যা সময়ের সঙ্গে নিজের গতিপথ বদলে নেয়। বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস সেই পরিবর্তনেরই জীবন্ত দলিল। প্রাচীন গুরুকুল ও বৌদ্ধ মহাবিহার থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মক্তব ও মাদ্রাসা, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার এবং বর্তমানের ডিজিটাল শিক্ষার যুগ প্রতিটি ধাপই আমাদের জাতীয় বিকাশের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাচীন বাংলার শিক্ষা ছিল সমাজকেন্দ্রিক, গুরুমুখী এবং নৈতিক মূল্যবোধনির্ভর। টোল ও চতুষ্পাঠীতে বেদ, উপনিষদ, ব্যাকরণ, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যা পড়ানো হতো। পাল আমলে সোমপুর মহাবিহার, বিক্রমশীলা, নালন্দা ও ওদন্তপুরী আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। চীন, তিব্বত, কোরিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে অধ্যয়ন করতে আসতেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন ও চারুকলাও তখন শিক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

সময়ের পরিক্রমায় সুলতানি ও মুঘল আমলে বাংলায় মক্তব ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা বিস্তার লাভ করে। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মক্তব এবং উচ্চশিক্ষার জন্য মাদ্রাসা ছিল প্রধান প্রতিষ্ঠান। রাজভাষা হিসেবে ফারসির গুরুত্ব বাড়ায় হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ফারসি শিক্ষা গ্রহণ করতেন। সে সময়কার শিক্ষা ছিল ধর্মীয় জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের চমৎকার এক সমন্বয়। এরপর ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শাসনের হাত ধরে শিক্ষা ব্যবস্থায় আসে মৌলিক পরিবর্তন। ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলের শিক্ষানীতির মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে। এর মূল উদ্দেশ্য ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য কেরানি বা নিম্নস্তরের কর্মকর্তা তৈরি করা হলেও, এই সময়েই রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও নবাব আবদুল লতিফের মতো সমাজ সংস্কারকদের উদ্যোগে আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাংলার উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর শিক্ষা পুনর্গঠন ছিল নতুন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন এবং কুদরাত এ খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। পরবর্তীতে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং বই উৎসবের মতো উদ্যোগ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত করেছে। নারী শিক্ষায়ও বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমান সময়ে আমরা ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চলছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিক্ষাকে নতুন মাত্রা দিলেও শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের বৈষম্য, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং মানসম্মত শিক্ষক সংকট এখনো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে প্রশ্ন জাগে, ২০৫০ সালের শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে কেমন হবে? ধারণা করা যায়, ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ শিক্ষাকে আমূল বদলে দেবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা শেখার পরিকল্পনা তৈরি করবে প্রযুক্তি। পরীক্ষার পরিবর্তে বাস্তব দক্ষতা, উদ্ভাবন ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাই হবে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঘরে বসেই যুক্ত হওয়া যাবে এবং শেখা আর নির্দিষ্ট বয়সের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না। তবে প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার মাঝেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করা। সবকিছু স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সহমর্মিতা, সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও মানবিকতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামীতে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে প্রতিষ্ঠিত করবে।

লেখক: মাহজাবীন তাসনীম রুহী শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ (অনার্স ২য় বর্ষ) এম. সি. কলেজ, সিলেট