বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

প্রাথমিক শিক্ষকদের জীবন ও সংগ্রামের গল্প

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

একটি বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর যেমন অগোচরে থেকে যায়, তেমনি এ দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অথচ, আড়ালে থেকে যাওয়া মানুষ গড়ার এই কারিগরদেরই আজ চরম অবহেলা আর অমানবিক নিয়মের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হচ্ছে। তাঁদের জীবনের গল্পগুলো কি সমাজ বা রাষ্ট্র আদৌ শুনতে চায়?

সকাল ৯টা একটি নির্দিষ্ট সময়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে স্কুলে হাজিরা দিতে গিয়ে শিক্ষকদের কত যে ধকল পোহাতে হয়, তা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই জানে। অনেক শিক্ষককে নিজের সংসার, ছোট শিশু বা বয়স্ক বাবা-মাকে সামলে বহুদূর পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের জন্য সকাল ৯টার এই ‘উপস্থিতি’ রীতিমতো এক নির্মম যুদ্ধ। দূরের পথ, যানজট আর সময়ের টানাটানিতে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠেন। মিনিট খানেক এদিক-ওদিক হলেই তাঁদের ‘অনুপস্থিত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষক কি তবে কোনো যন্ত্র? কেন তাঁদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের এই স্বাভাবিক বাস্তবতাগুলোকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা হবে না? এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ক্লান্তি।

শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য শিক্ষকের নিজের মানসিক সুস্থতা ও সতেজতা সবচেয়ে জরুরি। অথচ, দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে আটকে রেখে তাঁদের ওপর একধরনের মানসিক চাপ তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের কর্মঘণ্টা অনেক কম হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষকরা আনন্দের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারেন। প্রাথমিকের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা কমিয়ে এনে তা সহনীয় ও মানবিক করার দিকে নজর দিতে হবে।

এই কঠোর নিয়মকানুনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁদের বেতনবৈষম্য ও স্বল্পতা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে প্রাথমিকের একজন শিক্ষকের বেতন দিয়ে মাস পার করা কতটা দুঃসাধ্য, তা নিয়ে ভাবার যেন কেউ নেই। একটি শিক্ষিত, উন্নত ও মানবিক জাতি গড়ার গুরুদায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁদেরকেই কিনা দিন কাটাতে হয় অর্থকষ্টে! অথচ, তাঁদের হাত ধরেই শিশুরা বর্ণমালা শেখে, সততা শেখে এবং দেখে আগামীর স্বপ্ন। দেশ গড়ার এই কারিগরদের যদি প্রতিনিয়ত জীবনযাত্রার খরচের জন্য সংগ্রাম করতে হয়, তবে তাঁরা ক্লাসে কতটা মনোযোগ দিতে পারবেন?

একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে নিয়োগ ও যোগদানের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সঠিকভাবে সৎ ও দক্ষ শিক্ষকদের নির্বাচিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি নির্বাচিতদের দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগদান করানোও জরুরি। বছরের পর বছর নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখে বা যোগদানে বিলম্ব করিয়ে তরুণ মেধাবীদের স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। সঠিক সময়ে সঠিক মেধার মূল্যায়ন না হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত হওয়া অসম্ভব।

এই অবহেলার চিত্র শুধু তাঁদের আর্থিক বা সময়সূচিতেই সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষকরা আজও সমাজে তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পান না। অনেকেই তাঁদের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মতো দৃষ্টিতে দেখেন, যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও লজ্জাজনক। যে প্রাথমিক স্তর থেকে একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী বা রাজনীতিবিদ তৈরি হন, সেই স্তরের শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করা মানে পুরো জাতির মেধাকেই অবমূল্যায়ন করা।

শিক্ষক মানেই শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়; তাঁরা শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটান, তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে আজ সময় এসেছে এই অমানবিক নিয়ম ও বৈষম্য নিয়ে নতুন করে ভাবার। ৯টার কড়াকড়ি বা অনুপস্থিতির খড়গ ঝুলিয়ে নয়, বরং শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, দ্রুত যোগদান ও সম্মানজনক বেতন নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করুন, তাঁদের শ্রম ও আবেগকে সম্মান জানান। প্রাথমিক শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটা মানেই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল, সুন্দর ও শিক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই নীরব বিপ্লবীদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এখনই।

লেখক: শিক্ষার্থী, এমসি কলেজ, সিলেট।

শুভ্র/

বিঃদ্রঃ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি‘র সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।