স্বপ্ন আর পরিকল্পনার মায়াজালে

ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের জল্পনাকল্পনার কোনো শেষ নেই। আগামীকাল কী হবে, কোথায় থাকব, কীভাবে সফল হব, এমন হাজারো পরিকল্পনার জাল বুনেই আমাদের দিন কাটে। সত্যি বলতে, কোনো স্বপ্ন দেখলে আমরা তা নিয়ে কল্পনা করি, ভাবতে থাকি, কিন্তু সেটা বাস্তবে না পেলে সেই কল্পনা আর ভাবনাগুলোই আমাদের মারাত্মক ইতস্ততের কারণ হয়। জীবন তো আর আমাদের সাজানো ছক মেনে চলে না। তাই ভবিষ্যতের মায়াজালে আটকে না থেকে, কেবল চোখের সামনের বর্তমানকে শক্ত করে জাপটে ধরাই হতে পারে বেঁচে থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আমরা মানুষ, আর মানুষের মজ্জাগত স্বভাব হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে বোনা স্বপ্নের ভেতর বসবাস করা। আমরা আজ কেমন আছি, তার চেয়ে অনেক বেশি ভাবি আগামীকাল কোথায় থাকব। কিন্তু এই নিরন্তর ছুটে চলার পথে আমরা খুব কম সময়ই থেমে ভাবি, এই ভবিষ্যৎমুখী ভাবনাই আমাদের বর্তমানের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে কি না। স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়, কিন্তু যখন সেই স্বপ্ন আমাদের বর্তমানের বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে শেখায়, তখনই শুরু হয় আসল বিপত্তি।
ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় জীবনের একটি সুনির্দিষ্ট ছক কষতে। শিক্ষাজীবন পেরিয়ে পেশাগত জীবনের প্রতিটি ধাপে আমরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখি। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, নিখুঁত পরিকল্পনা করলেই বুঝি জীবন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। কিন্তু জীবন কোনো সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র মেনে চলে না। জীবনের নিজস্ব একটি গতি আছে, হঠাৎ বাঁক আছে।
যখন আমাদের খুব সযত্নে সাজানো ছকগুলো বাস্তবতার এক একটি ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যায়, তখন আমরা তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হই। এই যে পাঁচ বা দশ বছর পরের জীবনের কাল্পনিক চিত্র আমরা মাথায় নিয়ে ঘুরি, তা মূলত এক ধরনের প্রচণ্ড মানসিক বোঝা। এই বোঝা আমাদের আজকের দিনের ছোট ছোট আনন্দগুলো মন খুলে উপভোগ করতে দেয় না। আমরা ভবিষ্যতের এক কাল্পনিক পূর্ণতার আশায় বর্তমানের নিশ্চিত সময়গুলোকে হেলায় হারাতে থাকি।
স্বপ্নের নিজস্ব একটি মোহময় জগত আছে। আমরা যখন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করি, তখন সেই লক্ষ্যের চূড়ান্ত সাফল্যের চিত্রটি বারবার কল্পনায় আঁকতে থাকি। এই কল্পনা আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে যখন সেই কল্পনার বীজ ঠিকমতো অঙ্কুরিত হতে পারে না, তখন বুকের ভেতর তৈরি হয় এক বিশাল শূন্যতা।
প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির এই বিস্তর ফারাক আমাদের আত্মবিশ্বাসকে ভেতর থেকে নড়বড়ে করে দেয়। আমরা নতুন কোনো উদ্যোগে হাত দিতে ইতস্তত করি। মনে ভয় ঢুকে যায়, যদি এবারও পরিকল্পনা ভেস্তে যায়? এই ভীতি আমাদের স্বাভাবিক কর্মস্পৃহাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করে। যা হতে পারত তা নিয়ে আক্ষেপ করতে করতে আমরা ভুলে যাই, যা আছে তা নিয়ে কীভাবে বাঁচতে হয়।
তাহলে উপায় কী? জীবন কি কোনো লক্ষ্য ছাড়াই চলবে? বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। বরং এর অর্থ হলো জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ভবিষ্যতের অবাস্তব প্রত্যাশা বাদ দিয়ে কেবল বর্তমানের সাথে মানিয়ে চলাই হলো সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা।
প্রকৃতির দিকে গভীরভাবে তাকালে আমরা এই মানিয়ে নেওয়ার চমৎকার উদাহরণ দেখতে পাই। একটি চারাগাছ যখন রুক্ষ বা পাথুরে মাটিতে জন্ম নেয়, সে কিন্তু মাটি নরম হওয়ার অপেক্ষায় অলস বসে থাকে না। সে নিজের শিকড়কে পাথরের ফাঁক গলে গভীরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে গাছ যেমন পাতা ঝরিয়ে নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, আমাদের জীবনটাও ঠিক তেমনই হওয়া উচিত। চারপাশের পরিস্থিতি সবসময় আমাদের অনুকূলে থাকবে না। কিন্তু সেই মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়াই হলো বেঁচে থাকার সবচেয়ে কার্যকর মন্ত্র।
বর্তমানকে মেনে নেওয়ার মানে এই নয় যে আমরা অলস বা কর্মহীন হয়ে পড়ব। বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো, ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে আজকের দিনের কাজটুকুতে পুরো মনোযোগ দেওয়া।
ধরুন, আপনি কোনো একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছেন, হয়তো পত্রিকায় প্রকাশের জন্য কোনো লেখা তৈরি করছেন বা নতুন কিছু শিখছেন। আপনার লক্ষ্য যদি কেবল কাজটির চূড়ান্ত সাফল্য বা চারপাশের মানুষের স্বীকৃতি হয়, তবে কাজের প্রক্রিয়ায় আপনি কোনো আনন্দ পাবেন না। কিন্তু আপনি যদি শুধু আজকের দিনের কাজটি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করেন, তবে সেই কাজের ভেতরেই আপনি এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাবেন। আজ যখন আপনি আপনার প্রতিদিনের দায়িত্বগুলো একাগ্রতার সাথে পালন করবেন, আগামীকালের পথ এমনিতেই আপনার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। হারানোর বা অপ্রাপ্তির ভয় না থাকলে যেকোনো কাজে মনঃসংযোগ করা অনেক বেশি সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়।
জীবন খুব ছোট, আর সময় নদীর স্রোতের মতো দ্রুত বয়ে যায়। যা হতে পারত, বা যা হওয়া উচিত ছিল, তা নিয়ে আক্ষেপ করে কাটানোর মতো উদ্বৃত্ত সময় আমাদের হাতে নেই। স্বপ্ন আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মায়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের উচিত বর্তমানের মাটিতে শক্ত করে পা রাখা।
আজ, এই মুহূর্তটিই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। এই মুহূর্তকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নেওয়া, এর চারপাশের পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং এর মাঝেই নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার নামই হলো সত্যিকারের বেঁচে থাকা। তাই, ভবিষ্যতের অদেখা আর অনিশ্চিত স্বপ্নের পেছনে না ছুটে, আসুন আমরা বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে জাপটে ধরতে শিখি। কারণ, জীবনের আসল স্পন্দন ভবিষ্যৎ বা অতীতে নয়, তা স্পন্দিত হয় কেবলই আমাদের বর্তমানে।