বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: জনদুর্ভোগ ও আমাদের করণীয়

তানজিদ শুভ্র

হমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবার আসে পবিত্র রমজান। এই মাস আত্মশুদ্ধি ও সংযমের। কিন্তু আমাদের সমাজে রমজান মাস এলেই এক ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। সংযমের বদলে শুরু হয় ভোগের প্রতিযোগিতা। এর সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেন। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামে। একটি স্বাধীন ও মানবিক সমাজে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইসলামে ব্যবসাকে হালাল করা হয়েছে এবং সুদকে করা হয়েছে হারাম। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘ইহতিকার’ বলা হয়। নবী করিম (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করে সে অভিশপ্ত।

রমজান মাস যেখানে আমাদের সহমর্মিতা শেখায়, সেখানে নিজের পকেট ভারী করার জন্য অন্যকে কষ্টে ফেলা ধর্মীয় শিক্ষার সাথে একেবারেই বেমানান। একজন মানুষ রোজা রেখে কীভাবে অন্যের হক নষ্ট করতে পারেন, তা এক বিরাট প্রশ্ন। ওজনে কম দেওয়া বা খাদ্যে ভেজাল মেশানো রোজার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। পবিত্র এই মাসে সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য তার রহমতের দরজা খুলে দেন। অথচ আমরা মানুষের জন্য রিজিকের দরজা সংকীর্ণ করে ফেলি। এটি শুধু অন্যায় নয়, চরম অপরাধও বটে।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই প্রবণতা কেবল ধর্মীয় অবক্ষয় নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক স্খলনেরও জ্বলন্ত প্রমাণ। সারাদিন রোজা রাখার পর একজন স্বল্প আয়ের মানুষ যখন ইফতারের জন্য সামান্য ফল বা পুষ্টিকর খাবার কিনতে গিয়ে হিমশিম খান, তখন আমাদের পুরো সমাজ কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।

আমরা ভুলে যাই সমাজের প্রতিটি মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একজনের অতিরিক্ত মুনাফার লোভ আরেকজনের পরিবারের ক্ষুধার কারণ হতে পারে না। মানবিকতা, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ গঠন করা অসম্ভব। ব্যবসায় লাভ করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করা চরম অমানবিক কাজ।

বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে কেবল অসাধু ব্যবসায়ীরাই দায়ী নন, ভোক্তাদের আচরণও অনেকাংশে দায়ী। রমজান এলেই আমরা যেন আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। পুরো মাসের বাজার একসাথে করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয় আমাদের মধ্যে।

আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা বাজারের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দেয়। চাহিদার হঠাৎ এই ঊর্ধ্বমুখিতার সুযোগ নেয় মজুতদাররা। আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। রমজান কোনোভাবেই ভোজের মাস নয়। খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ আনা এই মাসের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই জনদুর্ভোগ কমাতে একক কোনো গোষ্ঠীর ওপর দায় না চাপিয়ে আমাদের সবার সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সবার আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে আরও কঠোর ও বাস্তবমুখী হতে হবে। শুধু লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা না করে সারা বছর নিয়মিত তদারকি করাটা বেশ জরুরি। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি আছে তা খুঁজে বের করার পাশাপাশি রাস্তায় চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে এবং বাজার কারসাজির সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। তাদের বুঝতে হবে রমজান মাস অতিরিক্ত মুনাফা করার সময় নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও ছাড় দেওয়ার মাস। বিশ্বের অনেক দেশে রমজান উপলক্ষে পণ্যের দাম কমানো হয়, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদেরও এখন এই মানবিক দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা উচিত। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প বাজারের প্রসার ঘটানো যেতে পারে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কিনে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ বাড়ানোর সাথে সাথে সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি সম্প্রসারিত করলে নিম্ন আয়ের মানুষ সহজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাবেন। আবার কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে গেলে ভোক্তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা সাময়িকভাবে বর্জন করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, কারণ চাহিদা কমলে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম কমাতে বাধ্য হবেন। সবশেষে, প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় সচেতন ক্রেতা গোষ্ঠী তৈরি করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অন্যায্য দামের বিরুদ্ধে সবাই সামাজিকভাবে সোচ্চার হলে স্থানীয় বাজারগুলোতে খুব সহজেই শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

পবিত্র রমজানের মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ ও সংযম। এই শিক্ষাকে যদি আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে কাজে লাগাতে না পারি, তবে মাসব্যাপী এই সিয়াম সাধনা কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। আসুন, এবারের রমজানে আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই। সরকার, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা, আমরা সবাই মিলে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করি। তবেই রমজানের পবিত্রতা রক্ষা পাবে এবং সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তিতে এই বরকতময় মাস পালন করতে পারবেন।