অস্তিত্বের অপরিহার্য বিভ্রম: মানুষ কেন মিথ্যায় বাঁচে?

‘মানুষ বাঁচে মিথ্যায়’—শুনতে খুব নেতিবাচক বা হতাশাজনক মনে হতে পারে। ছোটবেলা থেকে আমরা শিখেছি ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, মানব অস্তিত্বের একটা বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে নানামুখী বিভ্রম বা মিথ্যার ওপর।
এখানে মিথ্যা মানে কেবল শঠতা বা প্রতারণা নয়। এখানে মিথ্যা মানে হলো বাস্তবতা থেকে নিজেকে আড়াল করার কৌশল, কঠিন সত্যকে সহনীয় করে তোলার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রলেপ। কেন মানুষ মিথ্যায় বাঁচে, তার একটি তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করা যাক।
সামাজিক লুব্রিকেন্ট বা ভদ্রতার মুখোশ
সমাজ টিকে থাকে এক ধরনের ‘সম্মিলিত অভিনয়ে’। আমরা যদি প্রতিটি মুহূর্তেই নির্মম সত্য কথা বলতাম, তবে কোনো সম্পর্ক বা সমাজব্যবস্থা টিকত না।
ধরুন, কেউ আপনাকে জিজ্ঞেস করল, “আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?” সত্যটা হয়তো খুব নিষ্ঠুর, কিন্তু আপনি বললেন, “বেশ ভালো।” এই যে ছোট মিথ্যাটা, একে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন ‘সোশ্যাল লুব্রিকেন্ট’ বা সামাজিক ঘর্ষণ কমানোর তেল। আমরা প্রতিদিন শত শত ছোটখাটো মিথ্যা বলি অন্যের অনুভূতি বাঁচাতে, বিবাদ এড়াতে এবং নিজেকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে। এই মিথ্যাগুলো সমাজকে সচল রাখে।
আত্মপ্রবঞ্চনা বা ‘সেলফ ডিসেপশন’
মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো নিজেকে মিথ্যা বলা। মনোবিজ্ঞানে একে বলে ‘সেলফ ডিসেপশন’। আমরা নিজেদের সম্পর্কে এমন অনেক উচ্চ ধারণা পোষণ করি যা হয়তো বাস্তবিক নয়।
আমরা ভাবি, “আমি অন্যদের চেয়ে বেশি দয়ালু,” কিংবা “আমার সাথে খারাপ কিছু ঘটবে না।” পরিসংখ্যান বলে, দুর্ঘটনা বা রোগশোক সবারই হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্কের একটা অংশ আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দেয় যে আমরা নিরাপদ। এই মিথ্যা আশ্বাসটুকু না থাকলে মানুষ প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে থাকত। বিবর্তনবাদীরা বলেন, এই ‘ইতিবাচক বিভ্রান্তি’ বা পজিটিভ ইলিউশন আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। এটি আমাদের হতাশা থেকে বাঁচায় এবং ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করে।
আশাবাদের গল্প
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আগামীকাল কী হবে কেউ জানে না। তবুও মানুষ ঘর বাঁধে, সন্তান জন্ম দেয়, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে। কিসের ভিত্তিতে? এক ধরনের কাল্পনিক আশাবাদের ভিত্তিতে।
দার্শনিকরা একে বলেন ‘দ্য নোবল লাই’ বা মহৎ মিথ্যা। আমরা বিশ্বাস করি পরিশ্রম করলেই সাফল্য আসবে, ভালো করলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে। বাস্তবে সব সময় সমীকরণটা এমন হয় না। কিন্তু এই বিশ্বাস বা ‘মিথ্যা’টুকু আছে বলেই মানুষ সকালে ঘুম থেকে ওঠে, কাজে যায় এবং জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যায়। যদি মানুষ জানত দিনশেষে তার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে, তবে সে কাজ করার আগ্রহই হারিয়ে ফেলত।
সমষ্টিগত বিশ্বাস বা ‘ইমাজিনড রিয়েলিটি’
ইউভাল নোয়া হারারি তার ‘সেপিয়েন্স’ বইয়ে দেখিয়েছেন, মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা এমন সব জিনিসে বিশ্বাস করে যার ভৌত কোনো অস্তিত্ব নেই।
যেমন: টাকা। টাকার আসলে নিজস্ব কোনো মূল্য নেই, এটি এক টুকরো কাগজ বা ডিজিটাল সংখ্যা মাত্র। কিন্তু আমরা সবাই ‘বিশ্বাস’ করি এর মূল্য আছে। এই সম্মিলিত মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি। একইভাবে দেশ, সীমানা, আইন বা মানবাধিকার—এগুলো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না, এগুলো মানুষের তৈরি করা গল্প বা ধারণা। আমরা সবাই এই গল্পগুলো সত্য বলে মেনে নিয়েছি বলেই বড় পরিসরে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করতে পারি।
সত্যের ভার বনাম মিথ্যার আরাম
সত্য অনেক সময় খুব রূঢ়, শুষ্ক এবং অসহনীয়। সত্য হলো—মানুষ মরণশীল, জীবন নশ্বর এবং মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে আমাদের অস্তিত্ব নগণ্য। এই চরম সত্যকে সবসময় মনে রেখে বাঁচা কঠিন।
তাই মানুষ শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম এবং বিনোদনের মাধ্যমে নিজের চারপাশে এক ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ জগত তৈরি করে। টি এস এলিয়ট যেমন বলেছিলেন, “মানুষ খুব বেশি বাস্তবতা সহ্য করতে পারে না।” (Human kind cannot bear very much reality)। তাই আমরা গল্পের মিথ্যায়, সিনেমার ফ্যান্টাসিতে বা কাল্পনিক সুখের জগতে আশ্রয় খুঁজি। এই আশ্রয়টুকু আমাদের নিশ্বাস নিতে সাহায্য করে।
সুতরাং, ‘মানুষ বাঁচে মিথ্যায়’ কথাটি নিন্দার্থে নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে দেখা উচিত। সত্য যদি কঙ্কাল হয়, তবে মিথ্যা হলো রক্ত-মাংস আর চামড়া যা সেই কঙ্কালকে ঢেকে রাখে, তাকে সুন্দর দেখায়। আমরা জেনে বা না জেনে, সত্যের কদর্যতা থেকে বাঁচতে মিথ্যার এই নান্দনিক চাদর গায়ে জড়িয়েই জীবন পার করি।