লেপের কাপড় লাল হয় কেন?

শীতের সকালে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল রঙের লেপের ওম। গ্রামে কিংবা শহরে, ছাদের কার্নিশে বা উঠোনে রোদে মেলে দেওয়া লাল লেপের দৃশ্য বাঙালির শীতকালীন নস্টালজিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গলির মোড়ে লেপ তোশকের দোকানে স্তূপ করে রাখা লাল কাপড়ে মোড়ানো শীতের এই বিছানা ছাড়া যেন শীতের আমেজ অসম্পূর্ণ। আধুনিক যুগে কম্বল, ডুভেট বা অন্যান্য শীতবস্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও লাল লেপের আবেদন এতটুকু কমেনি। তবে কখনো কি ভেবে দেখেছেন, শীতের এই অপরিহার্য অনুষঙ্গটির রং কেন লালই হয়?
লেপের তৈরিতে লাল কাপড়ের ব্যবহারের পেছনে নিছক কাকতালীয় কোনো বিষয় নেই, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খানের আমলে মুর্শিদাবাদে লেপ তৈরির একটি সমৃদ্ধ কারুশিল্প গড়ে উঠেছিল। সে সময় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে লেপের আবরণে ব্যবহার করা হতো দামি লাল মখমল। ভেতরে থাকত তুলা এবং লেপকে আরও আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হতো সুগন্ধি। পরবর্তী সময়ে নবাব সুজাউদ্দিনের আমলে মখমলের পরিবর্তে সিল্ক ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। কালক্রমে সাধারণ মানুষের মধ্যে লেপের ব্যবহার বাড়লে দামি কাপড়ের জায়গা নেয় অপেক্ষাকৃত সস্তা কাপড়। কিন্তু আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের সেই লাল রংটি ঠিকই রয়ে যায়।
ঐতিহ্যের পাশাপাশি লেপের লাল রঙের পেছনে রয়েছে কিছু ব্যবহারিক কারণ। লেপের আবরণ সাধারণত নিয়মিত খুলে ধোয়া হয় না। বিশেষ করে তুলা দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী লেপ পরিষ্কার করা তুলনামূলক ঝামেলার বিষয়। লেপের ভেতরের তুলা, সেলাই এবং আকৃতি ঠিক রেখে পরিষ্কার করা সহজ নয়। তাই এর আবরণে এমন রং ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়, যাতে সাধারণ ধুলাবালি বা কিছু দাগ সহজে চোখে না পড়ে। গাঢ় লাল কিংবা লালচে রঙের কাপড়ে ময়লা হালকা রঙের কাপড়ের তুলনায় কম দৃশ্যমান হয়। তবে লাল কাপড় ময়লা আড়াল করতে পারলেও তা ময়লা বা জীবাণু দূর করে না। এর বাইরে বাজারে লাল কাপড়ের সহজলভ্যতা এবং ক্রেতার চাহিদাও একটি বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রঙের ব্যবহার চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা সেই রঙের কাপড় বেশি রাখেন এবং ক্রেতারাও দোকানে লাল লেপ দেখেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। উজ্জ্বল রং দোকানের পণ্যকে সহজে চোখে পড়ার মতো করে তোলে, যা একধরনের কার্যকর বিপণন কৌশলও বটে।
লেপের রং নিয়ে মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, লাল কাপড় বুঝি বেশি তাপ ধরে রাখে এবং লেপ বেশি গরম হয়। বৈজ্ঞানিকভাবে এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। লেপ কতটা গরম রাখবে, তা মূলত নির্ভর করে এর ভেতরে থাকা তুলার পরিমাণ, তুলার বিন্যাস, কাপড়ের প্রকৃতি এবং সেলাইয়ের ওপর। তুলার স্তরের মধ্যে আটকে থাকা বাতাস তাপের চলাচল কমাতে সাহায্য করে, ফলে শরীরের তাপ সহজে বাইরে যেতে পারে না। লেপের উষ্ণতার ক্ষেত্রে রঙের কোনো সরাসরি ভূমিকা নেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শীত নিবারণের অনুষঙ্গে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারপরও লাল লেপের পরিচিতি টিকে আছে স্বমহিমায়। কোনো পণ্যের ব্যবহার শুধু তার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পারিবারিক অভ্যাস, স্মৃতি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা পছন্দ। শীতের সকালে রোদে মেলে দেওয়া লাল লেপ তাই শুধু একটি শীতবস্ত্র নয়, এটি বাংলার ঘরোয়া জীবনের চিরচেনা একটি ছবি। নবাবি আমলের আভিজাত্য, ময়লা দাগ লুকানোর সুবিধা আর দীর্ঘদিনের অভ্যাসের প্রভাবেই হয়তো লাল লেপ আজ শীতের সবচেয়ে আপন অনুষঙ্গ হয়ে আছে।
শুভ্র/