বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

সুন্দরবনের নতুন ৭ প্রজাতির প্রাণীর ডিএনএ যাচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের জলজ ভাণ্ডারে যুক্ত হলো এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। সুন্দরবনের পানিতে নতুন করে পাওয়া ৫ প্রজাতির মাছ ও ২ প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য গবেষণায় এক অনন্য উদ্ভাবন ও নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য এক কর্মশালায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করবে গবেষক দল। এরপরই সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।

‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক ১৬ মাসব্যাপী এক বিস্তৃত গবেষণায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প’-এর আওতায় সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ মাস সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের (শরণখোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাই) ৬৫টি নদী ও খাল জরিপ করেন। এ ছাড়া বনের ভেতরে ৪২৪ কিলোমিটার এলাকায় নৌকা দিয়ে এবং শ্যামনগর, কয়রা, মোংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় মরফো-মলিকুলার পদ্ধতিতে মাইটোকন্ড্রিয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করে জীবের নিখুঁত ট্যাক্সোনমিক শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন পাঁচটি মাছ ও দুটি চিংড়ির প্রজাতি নথিবদ্ধ করা হয়। নতুন আবিষ্কৃত মাছগুলো হলো—বড় আইশ পারশে, ফোঁটা বাটা, বার্মিজ একঠুঁইটা, কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে এবং সবুজ ফোঁটা বেলে। এ ছাড়া পাওয়া গেছে সম্পূর্ণ নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি—মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি পোকা। এই প্রজাতিগুলোর ডিএনএ সিকোয়েন্স আগে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে ছিল না।

গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বাসসকে জানান, গবেষণার পর তাঁরা নতুন প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আমেরিকার আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে আপলোডের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে বিষয়টি বন বিভাগের হওয়ায় আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় প্রকল্পের চূড়ান্ত কর্মশালায় তা হস্তান্তর করা হবে এবং বন বিভাগের মাধ্যমেই তা জিন ব্যাংকে স্থান পাবে। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের কাছে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে। নতুন এই গবেষণার মাধ্যমে সুন্দরবনে মোট ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফলে আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে সুন্দরবনে এখন মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর সন্ধান মিলল। এর আগে ২০২০-২০২১ সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল কোরিয়ার সহযোগিতায় সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত করেছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, শরণখোলা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির বৈচিত্র্য (১৬৪ প্রজাতি) রয়েছে। তবে অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত আহরণ, পোনা মাছ ধরা এবং নদী-খালে ক্ষতিকর বিষ প্রয়োগের ফলে ভেটকি, পোয়া, পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। সুন্দরবনের এই জলজ ভাণ্ডার টিকিয়ে রাখতে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতি আহরণের সীমা নির্ধারণ, বিষ প্রয়োগ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা এবং প্রজনন নিশ্চিত করতে খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগার মতো খালগুলোকে ‘সংরক্ষিত খাল’ হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নতুন অর্জন সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী জলজ সম্পদ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।