শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

আদর্শ হিন্দু হোটেল: রান্নাঘরে শ্রমের বিদ্রোহ

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

মুহিবুল হাসান রাফি:

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শ হিন্দু-হোটেল (১৯৪০) কোনো বৃহৎ ঐতিহাসিক আখ্যান নয়; রানাঘাটের এক সাধারণ হোটেলকে কেন্দ্র করে নির্মিত শ্রম, আত্মমর্যাদা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম উপন্যাস। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজারী ঠাকুর দক্ষ রাঁধুনি, অথচ নিজের শ্রমের মালিক নন। তাই নিজের হোটেলের স্বপ্ন তার কাছে নিছক ব্যবসায়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; অন্যের অধীনে বিক্রি করা শ্রমকে নিজের পরিচয় ও স্বাধীনতায় রূপ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

হাজারীর চরিত্রের শক্তি তার অসাধারণত্বে নয়, সাধারণত্বে। কম মজুরি, অপমান ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও রান্নার গুণমান এবং খদ্দেরের প্রতি সততা নিয়ে তার যে অনড়তা, সেটিই তাকে আলাদা করে। তার ‘আদর্শ’ হোটেল মূলত এমন এক কর্মপরিবেশের কল্পনা, যেখানে শ্রমের মূল্য থাকবে এবং ব্যবসা প্রতারণার ওপর দাঁড়াবে না। ফলে নৈতিকতা এখানে বিমূর্ত আদর্শ নয়; তার জীবিকা ও পেশাগত বোধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এই নৈতিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে পদ্ম ঝির ক্ষমতা। তাকে শুধু কুটিল প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে চরিত্রটির জটিলতা নষ্ট হয়। বেচু চক্কত্তির হোটেলে তার আনুষ্ঠানিক মালিকানা নেই, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক প্রভাব প্রবল। হাজারীর দক্ষতা ও সম্ভাব্য উত্থান তার অবস্থানের জন্য অস্বস্তিকর। তাই তাদের সংঘাত ব্যক্তিগত বিদ্বেষের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভেতর শ্রম ও ক্ষমতার অসম সম্পর্ককেও প্রকাশ করে। পদ্মের আচরণে ব্যক্তিগত ঈর্ষা যেমন আছে, তেমনি আছে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবৃত্তি।

কুসুমের সঙ্গে হাজারীর সম্পর্ক উপন্যাসে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানবিক মাত্রা তৈরি করে। তাদের সম্পর্ক রক্তের নয়, কিন্তু বিশ্বাস ও স্নেহের। কুসুম হাজারীর জীবনে এমন এক আশ্রয়, যেখানে অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে পারস্পরিক মানবিকতা কাজ করে। ফলে উপন্যাসটি দেখায়, অর্থের অভাবেও সম্পর্ক কখনো মানুষের জীবনে কার্যকর পুঁজি হয়ে উঠতে পারে।তবে হাজারীর সাফল্যকে কেবল ‘শ্রমের জয়’ বলা যথেষ্ট নয়। তার দক্ষতা, সততা ও অধ্যবসায়ের পাশাপাশি আকস্মিক সৌভাগ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই উপন্যাসের বাস্তববাদে রূপকথার হালকা ছায়া পড়ে। বাস্তব জীবনের কঠিন অর্থনৈতিক কাঠামো সাধারণত এত সহজে ব্যক্তিগত সাফল্যের পথ খুলে দেয় না। কিন্তু বিভূতিভূষণের লক্ষ্য সম্ভবত নিখুঁত অর্থনৈতিক বাস্তবতা নির্মাণ নয়; বরং সৎ শ্রমের স্বীকৃতিকে একটি মানবিক কল্পনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

নিজের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর হাজারীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ক্ষমতার ব্যবহারে। যে মানুষ অপমান ও অবিচারের শিকার হয়েছে, সে ক্ষমতাবান হয়ে প্রতিহিংসার পুনরাবৃত্তি করে না। পুরোনো বিরোধীদের প্রতিও তার আচরণে যে উদারতা দেখা যায়, সেটিই তার নৈতিক উত্তরণ। সাফল্য তাকে কেবল মালিক বানায় না; তাকে তার পূর্বতন অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে উঠতেও শেখায়।বিভূতিভূষণের গদ্যে হোটেলের রান্নাঘর, খদ্দের, হিসাব, রেলবাজারের ব্যস্ততা ও খাবারের বিবরণ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জীবন্ত সামাজিক পরিসর। আবার চূর্ণীর ধারে হাজারীর নির্জনতা তার অন্তর্গত স্বপ্নের বিপরীত সুর তোলে। একদিকে জীবিকার হিসাব, অন্যদিকে নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা এই দ্বন্দ্বেই উপন্যাসের প্রাণ।

আদর্শ হিন্দু-হোটেল তাই সাফল্যের সরল গল্প নয়। এটি শ্রমের মর্যাদা, আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতা পেয়েও মানুষ থাকার পরীক্ষার উপন্যাস। হাজারীর সবচেয়ে বড় অর্জন নিজের হোটেল নয়; নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের ভাষা উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ না করা। সেখানেই তার প্রকৃত ‘আদর্শ’।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ

শুভ্র/