মাইমুনা খাঁনের গল্প ডাকাতিয়ার ওপারে

ডাকাতিয়ার ওপারে
মাইমুনা খাঁন
ডাকাতিয়া নদীর পাড় ঘেঁষে ছোট্ট একটি গ্রাম, অরুলি। নামের মতোই ভীতিপ্রদ তার ইতিহাস। কয়েক শতাব্দী আগেও ডাকাতিয়া নদী পার হওয়ার কথা ভাবলেই মাঝিদের মনে ভেসে উঠত জলদস্যুদের বিভীষিকা। নদীর দুই পাড়ের ঘন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকত তারা। সুযোগ পেলেই দল বেঁধে হামলা করত। মানুষ হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া ছিল এ অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাই ‘ডাকাতিয়া’ শুধু একটি নদীর নাম নয়, বরং আতঙ্কের প্রতীক।
আর সেই ডাকাতিয়া ঘাটেই প্রতিদিন গল্পের আসর বসান ফজল গাজীর ছেলে মালেক গাজী। বার্ধক্যের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও গল্পের আসরে তিনিই নায়ক। রহস্যের চাদরে মুড়ে দেন প্রতিটি ঘটনা। প্রতিদিনের মতো আজও তাঁর গল্পের আসর শুরু হলো।
“হুন, আমি তহন ছোড আছিলাম। রাইতের বেলা দাদার লগে গেছি মাছ ধরতে। ঝোপের ভিতরে যে জলদস্যুরা আছিল, হেইডা দেহি নাই।”
বাচ্চাদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করল, “হেরপর কী অইল?”
মালেক গাজী উত্তর দিলেন, “হেরপর ঝাঁপাইয়া পড়ছে দাদা আর আমার উপর। দাদা কয়, ‘মালেক, টেঁটাডা আমারে দে।’ দাদারে টেঁটা দেওনের পর দাদা দুইডারে পুরা মাইরা লাইছে। আর বাকিডি ভয়ে দৌড় দিছে। হেরপর থেইকা দাদার পিছে পিছে ঘুরতাম। দাদায় অনেক কিছু শিখাইছে রে।”
গল্পের আসরের মাঝখান থেকে হঠাৎ সাজেদা বলে উঠল, “দাদা, আমগো আক্কাসও সাহসী হইবো।”
কথা শেষ হতে না হতেই আফিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল, “সারাদিন এও ভাই, ভাই করছ কেন রে? তোর বুঝি একলাই ভাই আছে?”
“আমার ভাই আছে দেইখাই কই। তোর নাই, হেইলাই তোর গা জ্বলে।”
আফিয়া বুক ফুলিয়ে বলল, “হুন, মা-য় কইছে আমাগো ভাই হইবো। তহন তোরে দেহাইয়া দিমু। তোর ভাইয়ের মতো হাবলা-মোডু হইবো না।”
রেগে গিয়ে সাজেদা বলল, “আফিয়া, মাথা গরম করবি না কইলাম। তাইলে তোর ভাই হইবো চোরা মুখলেস কাকার মতো!”
“আমার ভাই লইয়া একটাও কথা কবি না।”
“কইলে কী করবি তুই?”
মুহূর্তেই শান্ত পরিবেশ রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। কথা-কাটাকাটি গড়াল হাতাহাতিতে।
স্বামী, মেয়ে আর ছোট্ট সংসার নিয়ে একচালা ঘরেই রুমালী বেগমের বসবাস। আর কদিন পরই তাঁর গর্ভাবস্থার নয় মাস পূর্ণ হবে। এ সময় ঘরের বাইরে বের হওয়া যেন বড়দের চোখে গুরুতর অপরাধ। পৃথিবীতে আসতে চলেছে একটি নতুন প্রাণ—এই ভাবনাতেই দিন কাটে তাঁর।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এল ডাক, “ইকবালের বউ, আছনি গো?”
ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন রুমালী।
আকলিমা বেগম রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, “এই দেহো, তোমাগো আফিয়া করছে ডা কী! আমাগো সাজেদারে ঘুষি মাইরা নাক ফাডাইয়া লাইছে। এমন করলে থাহুম কেমনে, কও? শেষবার কইতাছি, তোমাগো আফিয়ারে ডাক দিয়া রাখবা। নাইলে আমি দরবার লইয়া বহুম।”
অভিযোগ শেষ করেই মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন তিনি।
এ দৃশ্য অবশ্য রুমালী বেগমের কাছে নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই কারও না কারও নালিশ শুনতে হয় তাঁকে। তাই এসব শুনে এখন আর খুব একটা বিচলিত হন না।
অরুলি গ্রামের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। চারদিকে যখন গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষ হাঁসফাঁস করে, তখনও এ গ্রাম যেন শান্ত, শীতল। ভরদুপুরেও এখানকার মানুষের মুখে ক্লান্তির ছাপ দেখা যায় না।
কিন্তু আফিয়া জানে, আজ ঘরে ফেরা মানেই বিপদ।
ভয়ে ভয়ে দরজার চৌকাঠ পেরোতেই দাদি গপ করে তার হাত চেপে ধরলেন।
“এই মাইয়া, সারাদিন টইটই কইরা কই ঘুইরা বেড়াস? মা-ডা যে সকাল থেইকা ব্যথায় মইরা যাইতাছে, হেই খবর আছে?”
মাথা নিচু করে সব শুনতে লাগল আফিয়া।
ছোট হলেও সে বুঝতে পারে, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা মায়ের আর্তনাদ নতুন একটি প্রাণকে পৃথিবীর আলো দেখানোর লড়াই।
হঠাৎ আর কিছু না ভেবেই সে মায়ের ঘরের দিকে দৌড় দিল।
পেছন থেকে দাদি চিৎকার করে উঠলেন, “এহন যাইস না! এ অবস্থায় কেউ মায়ের ধারে যায় না।”
কিন্তু সে শুনল না।
মায়ের পায়ের পাশে বসতেই তার চোখ বেয়ে নেমে এল অঝোর জল। আজ মা তাকে বকছেন না, শাসন করছেন না। শুধু কষ্টে কাঁপতে কাঁপতে তার হাত শক্ত করে ধরে আছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রসববেদনা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
বাইরে মেঘের গম্ভীর গর্জন, আর ঘরের ভেতর মায়ের বুকফাটা চিৎকার।
ছোট্ট আফিয়ার মনে প্রথমবারের মতো প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় বাসা বাঁধল।
সে ছুটে গিয়ে দাদিকে ডাকল। আশপাশের মানুষকেও খবর দিল।
এই মুহূর্তে সে শুধু একটি কথাই জানে—মাকে বাঁচাতে হবে। আর নতুন মানুষটিকে পৃথিবীর আলো দেখাতে হবে।
তার চিৎকার শুনে দাদিসহ আশপাশের কয়েকজন মহিলা ছুটে এলেন। সবাই মিলে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
আফিয়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
এই প্রথম সে বুঝতে পারল, সে কতটা অসহায়।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।
অসহায় চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে আফিয়া। আজ এই বৃষ্টিও তার কাছে অসহ্য লাগছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতিও যেন তার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিতে চাইছে।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এল এক নবজাতকের কান্না।
দাদির কণ্ঠ শোনা গেল, “রে আফিয়া, তোর ভাই হইছে!”
মুহূর্তেই ছুটে গেল সে।
কিন্তু মা? মা কি ঠিক আছে?
আফিয়া দাদির মুখের দিকে তাকাল। দাদির চেহারায় তখনও অন্ধকারের ছায়া।
আফিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “দাদি… মায়ের কী অইছে? মা ঠিক আছে তো?”
কয়েক মুহূর্ত পর দাদি মৃদু হেসে বললেন, “ভালো আছে রে।”
এই একটি বাক্যেই যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ এসে জমা হলো আফিয়ার ছোট্ট হৃদয়ে। তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। মা ভালো আছেন, আর তার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়ে এসেছে ছোট্ট এক ভাই।
সেদিন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হয়েছিল তার।
যে আকাশের গম্ভীর গর্জন তার মনে মাকে হারানোর ভয় জাগিয়েছিল, সেই আকাশের নামেই সে ভাইয়ের নাম রাখল—আসমান।
সে মনে মনে বলল, “আমার ভাই আসমানের মতোই বিশাল হইব। সবারে আগলাইয়া রাখব।”
এরপর থেকে আফিয়ার পৃথিবী যেন বদলে গেল।
আগের মতো সারাদিন বাইরে ছুটে বেড়ায় না সে। তার সমস্ত সময় জুড়ে এখন ছোট্ট আসমান।
সে ধীরে ধীরে ভাইকে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করল।
আকাশ দেখিয়ে বলত, “দেখছস? এইডা হইল আসমান। তুইও এর মতো বড় হইবি। সবাইরে আগলাইয়া রাখবি।”
পাখি উড়ে গেলে বলত, “ওইডা পাখি। দেইখ, কেমন উড়ে!”
গাছ, ফুল, নদী, মেঘ—সবকিছুর সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিত সে।
আসমান ড্যাবড্যাব করে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। হঠাৎ একটু হাসত। সেই হাসিতেই আফিয়া বুঝে যেত, পৃথিবীর সঙ্গে তার ভাইয়ের পরিচয় একটু একটু করে হয়ে যাচ্ছে।
দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মাস গড়িয়ে বছর আসে।
একটু একটু করে বড় হতে থাকে আসমান। আর বাড়তে থাকে আফিয়ার দায়িত্ব।
খেলার সাথীরা ডাকতে এলে সে হেসে বলত, “তোরা যা। আমার কাজ আছে।”
বন্ধুরা মুখ বাঁকিয়ে চলে যেত। কিন্তু আফিয়ার কোনো আফসোস হতো না। কারণ তার সবচেয়ে প্রিয় খেলনা, সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, সবচেয়ে প্রিয় দায়িত্ব—সবই এখন আসমান।
আসমানের বয়স যখন তিন বছর, তখন সে অল্প অল্প কথা বলতে শেখে।
প্রতিদিন রাতে আফিয়া তাকে গল্প শোনায়। বাঘ-সিংহের গল্প, রাজা-রানির গল্প, পরী, দৈত্য আর চাঁদের বুড়ির গল্প।
গল্প শুনতে শুনতেই একসময় আসমানের চোখ বুজে আসে। সে ঘুমিয়ে পড়ে।
আর আফিয়া অনেকক্ষণ ধরে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মনে হয়, এই ছোট্ট মানুষটাই যেন তার পুরো পৃথিবী।
আসমানকে নিয়ে এখন প্রায়ই ডাকাতিয়ার পাড়ে ছুটে যায় আফিয়া। মা রুমালী বারবার নিষেধ করেছেন, ওদিকে যেন না যায়।
আফিয়ার মনে প্রশ্ন জাগে, ‘ক্যান যামু না? নদী কি গিইলা খাইয়া ফেলব?’
মায়ের নিষেধ অমান্য করেই একদিন ছোট্ট আসমানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
পথে দেখা হয়ে গেল সাজেদা আর আক্কাসের সঙ্গে।
দেখামাত্রই আফিয়া মুচকি হেসে খোঁচা দিল, “কিরে সাজেদা, হুনলাম আক্কাসরে নাকি খেলার পোলাপাইন কুত্তার দৌড় খাওয়াইছে? দৌড় দিতে দিতে প্যান্টও নাকি খুইলা ওলট খাইয়া নদীতে পড়ছে! তুই না কইছিলি, হে খুব সাহসী হইব?”
সাজেদার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
“আফিয়া, মাথা গরম করাইস না। আমারও সময় আইব। দেইখা রাহিস।”
এ কথা বলেই সে আক্কাসের হাত ধরে হনহন করে চলে গেল।
তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আফিয়া আর আসমানের হাসির শব্দ ভেসে রইল।
নদীর কাছে পৌঁছাতেই আফিয়ার মুখে এক অপার তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
পশ্চিম আকাশে কালো মেঘ জমেছে। শঙ্খচিলগুলো নিচু হয়ে উড়ছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
এ সময় ডাকাতিয়া যেন নিজের প্রকৃত রূপ ধারণ করে। এই রূপটাই আফিয়ার সবচেয়ে প্রিয়।
নদীকে এমন উন্মত্ত, এমন বুনো দেখলেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক টান অনুভব হয়। মনে হয়, নদী যেন তাকে ডাকছে।
কিন্তু কেন? কী বলতে চায়?
সে জানে না।
অন্যদিকে ছোট্ট আসমানের বুক কেঁপে উঠল। সে বোনের হাত শক্ত করে ধরে বলল, “আফা… চল। আমার ভালা লাগতাছে না।”
কিন্তু আফিয়া তখনও পশ্চিমের আকাশে তাকিয়ে মুগ্ধ।
কালো মেঘ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। তার সঙ্গে বাড়ছে বাতাসের বেগ। মুহূর্তের মধ্যেই ঝড় যেন তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
হঠাৎ এক প্রচণ্ড দমকা হাওয়া। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।
আফিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোট্ট আসমান ছিটকে পড়ল নদীতে।
“আসমান!”
চিৎকার করে নদীতে ঝাঁপ দিল আফিয়া।
সেই মুহূর্তে ডাকাতিয়া যেন আর নদী নয়, এক ক্ষুধার্ত দানব। তার প্রতিটি ঢেউ যেন বিশাল একেকটি মুখ, গ্রাস করে নিতে চাইছে সবকিছু।
প্রচণ্ড স্রোতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কোনো রকমে আসমানের হাত আঁকড়ে ধরল আফিয়া। সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে তাকে পাড়ে তুলে দিল।
আসমান কাঁদতে কাঁদতে উঠে বসল।
এবার নিজের পালা।
আফিয়া পাড় ধরে ওপরে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই ভেঙে পড়ল পাড়ের মাটি। সে আবার স্রোতের ভেতর তলিয়ে গেল।
পাড়ে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আসমান বুকফাটা চিৎকার করছে, “আফা…!”
কিন্তু ঝড়ের গর্জনে সেই ডাক হারিয়ে গেল।
চারপাশে একজন মানুষও নেই।
আফিয়া প্রাণপণে স্রোতের সঙ্গে লড়ছে। বারবার পাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে, আবার ঢেউ তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
তার শরীর ক্লান্ত। নিঃশ্বাস ভারী। তবুও সে হার মানল না।
চিৎকার করে বলল, “আসমান… কাঁদিস না… আফা আছে… তোর লগেই আছে…”
আসমানও কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, “আফা… তোর কিছু হইব না…”
আফিয়া ভাইয়ের কথাগুলো বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ল।
মুহূর্তেই তাকে নিজের বুকের ভেতর গিলে নিল ডাকাতিয়া।
তারপর…
সব শান্ত।
শুধু উত্তাল নদী। আর পাড়ে দাঁড়িয়ে নির্বাক এক শিশুর কান্না।
পাড়ে দাঁড়িয়ে আসমান তখনও নির্বাক। তার চোখদুটো নদীর বুক চিরে একটানা কিছু খুঁজে ফিরছে।
হঠাৎ সে অনুভব করল, কেউ তার কাঁধে হাত রেখেছে।
পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল—মা। রুমালী।
আসমান কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটি কথাই বলতে পারল, “আফা…”
আর একটি শব্দও উচ্চারণ করার প্রয়োজন পড়ল না। মা সব বুঝে গেলেন।
পরক্ষণেই তাঁর বুকফাটা আর্তনাদে যেন কেঁপে উঠল ডাকাতিয়ার দুই পাড়।
চারদিক থেকে মানুষ ছুটে এল। শুরু হলো খোঁজাখুঁজি।
এক ঘণ্টা… দুই ঘণ্টা… তিন ঘণ্টা…
অবশেষে পাঁচ ঘণ্টার নিরন্তর চেষ্টার পর ডাকাতিয়া ফিরিয়ে দিল আফিয়াকে।
নিথর। নিঃশব্দ।
যে মেয়েটি সারাক্ষণ হাসত, দৌড়ে বেড়াত, ভাইকে গল্প শোনাত—সে আজ নিশ্চুপ।
বাদ জোহর আফিয়ার জানাজা।
সাদা কাফনে মোড়ানো তার দেহের চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের মানুষ।
আজ মালেক গাজীর গল্প নেই। আজ কারও মুখে হাসি নেই। আজ সাজেদাও নিশ্চুপ।
যে মেয়েটার সঙ্গে প্রতিদিন ঝগড়া করত, আজ তাকে এভাবে দেখতে হবে—এ কথা সে কখনো ভাবেনি।
রুমালী বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। মায়ের বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি আহাজারি যেন বাতাসকেও ভারী করে তুলছে।
আফিয়ার মাথার ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট আসমান। সে এখনও বুঝতে পারেনি মৃত্যু কাকে বলে।
তার শুধু মনে হচ্ছে, আফা কেন শুয়ে আছে? কেন কথা বলছে না? কেন তাকে গল্প শোনাচ্ছে না? কেন তাকে কোলে নিচ্ছে না? কেন তাকে নিয়ে নদীর পাড়ে যাচ্ছে না?
জানাজার নামাজ শেষ হলো। চারজন মানুষ খাটিয়া কাঁধে তুলে নিলেন।
ঠিক তখনই আসমান হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দুই হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, “আমার আফা… আমার আফা… আমার আফারে কই নিয়া যাও?”
তার কান্না শুনে উপস্থিত অনেকেরই চোখ ভিজে উঠল। কিন্তু কেউ উত্তর দিতে পারল না।
জানাজা শেষে মানুষ একে একে ফিরে যেতে লাগল। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। ডাকাতিয়ার ঢেউগুলো যেন আগের মতোই নিশ্চুপ। কিছুই যেন ঘটেনি।
মালেক গাজী অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে আজ গল্পের ঝিলিক নেই। কাঁপা হাতে লাঠিটা শক্ত করে চেপে ধরে ধীরে ধীরে বললেন, “হুনছস? আমি সারা জীবন জলদস্যুর গল্প কইছি। ভাবতাম, দস্যুরাই মানুষের প্রাণ নিত।”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“অহন বুঝি… দস্যুরা মইরা গেছে। কিন্তু ডাকাতিয়া মরে নাই। এই নদীই সবচেয়ে বড় দস্যু।”
চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু নদীর ঢেউ এসে পাড়ে আছড়ে পড়ছে।
তিনি ধীরে ধীরে চলে গেলেন।
ডাকাতিয়া বয়ে চলল।
আজও ডাকাতিয়ার পাড়ে আফিয়ারা জন্ম নেয়। তাদের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়ে পৃথিবীতে আসে কোনো না কোনো আসমান।
তারা একসঙ্গে বড় হয়। নদীর পাড়ে ছুটে বেড়ায়। ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশ দেখে। শঙ্খচিলের উড়ে যাওয়া দেখে। জ্যোৎস্নারাতে নদীর বুকে চাঁদের আলো গলে যেতে দেখে। গোধূলির লাল-কমলা আকাশে হারিয়ে যায়।
তারপর…
একদিন ডাকাতিয়া আবার তার অপরূপ সৌন্দর্য মেলে ধরে। মানুষ মুগ্ধ হয়। ভুলে যায়, সৌন্দর্যেরও কখনো কখনো ভয়ংকর মূল্য দিতে হয়।
ডাকাতিয়া যেন ফিসফিস করে বলে, “আমায় দেখতে হলে, তোদের কিছু দিতে হবে।”
আর মানুষ তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে সেই সতর্কবাণী শুনতে পায় না।
ডাকাতিয়া আজও ক্ষুধার্ত। আজও তৃষ্ণার্ত।
সে আজও অপেক্ষা করে—আর কত প্রাণ নিলে তার ক্ষুধা মিটবে?
শুভ্র/