সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

অগ্নিপ্রভাত উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের মানবিক অভিঘাত ও একটি পাঠচক্র

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

মুহিবুল হাসান রাফি:

ঘড়িতে সময় রাত ৯টা ২৩ মিনিট। মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুমিল্লা ও নোয়াখালীর কিছু জায়গায় দাপ্তরিক কাজ শেষ করে সবেমাত্র চট্টগ্রামে এলাম। পাহাড়িকা এক্সপ্রেসে আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে বাসে আসতে হলো। রাত ১০টা ১১ মিনিটে চট্টগ্রাম বাতিঘরে অআকখ এর সংগঠক পাপিয়া কোর মেম্বার প্রীতি ও রাজশাহী বিভাগের প্রতিনিধি লিখনের সঙ্গে দেখা হলো। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক সাঈদ আজাদ ও কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পরিচয়ের পর কিছুটা খোশগল্প হলো। পরক্ষণেই রাতের মতো বিদায় নিয়ে সাঈদ আজাদ ও হরিশংকর জলদাস নিজ গন্তব্যে চলে গেলেন। এরপর আমি পাপিয়া প্রীতি ও লিখন চট্টগ্রাম শহরের ল্যাম্পপোস্টের আলো মাখিয়ে কাজীর দেউড়ি মোড়ের একটি যাত্রীছাউনির চায়ের দোকানে থামলাম। চা পান শেষে ক্লান্ত শরীরে সবাই রাতের মতো বিদায় নিলাম।

ভোর ৪টা ১৩ মিনিট। ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি করে কিছু কাজে বেরিয়ে পড়লাম। ভোর হতেই শুরু হলো নিত্যদিনের ব্যস্ততা। সংবাদ কভারেজ সেশন ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজসহ মোট ২১টি প্রোগ্রাম ছিল সেদিন। এর সঙ্গে যুক্ত হলো অআকখ এর অনুষ্ঠান। টানা ৯টি প্রোগ্রাম শেষ করে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছাই। প্রচণ্ড ক্লান্তির মধ্যেও সার্কিট হাউসে পাপিয়া প্রীতি লিখন ও সাঈদ আজাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটল। এরপর জুমার নামাজ আদায় ও এক বন্ধুর জানাজায় অংশ নিয়ে দুপুরের খাবার সেরে ফের বেরিয়ে পড়লাম।

দুপুর গড়িয়ে এল। রোদের প্রখরতা ক্রমশ বাড়ছে তাপমাত্রা প্রায় ৩৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুপুর ২টা ৩৯ মিনিটে চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব সংলগ্ন থিয়েটার ইনস্টিটিউটে পৌঁছাই। সেখানে অআকখ চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি নাফিসা নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। একে একে সেখানে জড়ো হতে থাকেন লেখক ও পাঠকেরা। উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় চট্টগ্রামের অষ্টম অআকখ অফলাইন পাঠচক্র। এবারের পাঠচক্রের নির্ধারিত বই ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক সাঈদ আজাদের উপন্যাস অগ্নিপ্রভাত। চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি নাফিসা নবীর সঞ্চালনায় শুরু হয় আলোচনা সমালোচনা গল্প আড্ডা ও সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে পর্যালোচনা।

পাঠচক্রে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অগ্নিপ্রভাত উপন্যাসের লেখক সাঈদ আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির ফোকলোর পরিচালক তপন বাগচী প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ অআকখ এর সংগঠক কোর মেম্বার পাঠচক্র পরিচালনা দল ও রাজশাহীর টিম লিডারসহ অসংখ্য বইপড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা জানান এটি মুক্তিযুদ্ধ সফলতা লাভ করার আগের প্রেক্ষাপটে লেখা একটি সার্থক উপন্যাস যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিছুই অনুধাবন করা যাবে। পাঠ পর্যালোচনায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বীভৎস অত্যাচার পাশবিক নির্যাতন ও গা শিউরে ওঠার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। পাঠচক্রে বইপাঠ সাহিত্যবোধ ও মননশীল পাঠচর্চার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ধরনের আয়োজন পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের সংযোগ দৃঢ় করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকেরা।

অগ্নিপ্রভাত ও মুক্তিযুদ্ধের বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিজয় একটি চূড়ান্ত অর্জন কিন্তু সাহিত্যে সেই বিজয়ের অর্থ অনুসন্ধান করতে হয় মানুষের হারানো জীবন ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেতর দিয়ে। কারণ রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস আর সেই জন্মের মূল্য বহন করা মানুষের ইতিহাস এক নয়। সাঈদ আজাদের অগ্নিপ্রভাত এই দুই বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার চেষ্টা করেছে। উপন্যাসটির বিশেষ আগ্রহ যুদ্ধের সামরিক বিবরণে নয় বরং যুদ্ধ কীভাবে একটি পরিবারের অস্তিত্ব সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করে সেই মানবিক অভিঘাতে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাবিল ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মরিয়ম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা তাঁদের পরিচিত জীবনের ভিত্তি ভেঙে দেয়। হাবিলের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং মরিয়মের স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে বৃহত্তর জাতীয় বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। এখানে একটি পরিবারের ভাঙন শুধু কাহিনির সংকট নয় এটি এমন এক সময়ের প্রতীক যখন মানুষের ঘর আত্মীয়তা ও নিরাপত্তার বোধও সহিংসতার মুখে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

আখ্যানগত তাৎপর্যের দিক থেকে ইতিহাসের বৃহৎ ঘটনাকে লেখক ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল মৃত্যুর পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না তা প্রকাশিত হয় প্রিয়জনের অনুপস্থিতি আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা এবং আগামী দিন সম্পর্কে নিশ্চয়তা হারানোর মধ্য দিয়ে। হাবিল ও মরিয়মের অভিজ্ঞতা সেই অদৃশ্য ক্ষতগুলোকে দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি করে। তবে এই প্রয়াসের শিল্পসার্থকতা নির্ভর করে ব্যক্তিগত বিপর্যয়গুলো কতটা স্বতন্ত্র চরিত্রের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে এবং কতটা বৃহত্তর ইতিহাসের সঙ্গে জৈবিকভাবে যুক্ত হয়েছে তার ওপর।

মরিয়মের চরিত্র উপন্যাসটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠসূত্র। তার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থান কাহিনিতে কেবল একটি পরিস্থিতিগত উপাদান নয় এটি জীবন ও মৃত্যুর অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার দ্বন্দ্বকে তীব্র করে। চারপাশে যখন পরিচিত পৃথিবী ভেঙে পড়ছে তখন অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার দায়িত্ব মরিয়মের সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দেয়। সে এক দিকে স্বজনহারা নারী অন্যদিকে ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যাশায় এগিয়ে চলা মানুষ। তার মাতৃত্ব তাই নিছক আবেগের বিষয় নয় যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক শক্তির বিপরীতে জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রতীকী তাৎপর্যও বহন করে।

এই প্রতীকী মাত্রা উপন্যাসের শিরোনামকে অর্থবহ করে তোলে। অগ্নি ধ্বংস দহন ও বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে এবং প্রভাত নির্দেশ করে নতুন দিনের সম্ভাবনা। দুই বিপরীত অর্থের এই সংযোগ মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে ভয়াবহ ধ্বংস ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। মরিয়মের সন্তান জন্মদানের প্রত্যাশা এবং নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মধ্যে স্থাপিত রূপকধর্মী সম্পর্ক তাই ব্যক্তিগত মাতৃত্বকে জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে।

উপন্যাসে একাধিক নারী চরিত্রের উপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে শুধু পুরুষের বিচ্ছিন্নতা কিংবা যুদ্ধকেন্দ্রিক বয়ানে সীমাবদ্ধ রাখেনি। নারীর নিরাপত্তাহীনতা নির্যাতন ও টিকে থাকার সংগ্রাম যুদ্ধের সামাজিক অভিঘাতকে সামনে আনে। আখ্যানের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনার সমাবেশও যুদ্ধের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরে। সব মিলিয়ে অগ্নিপ্রভাত মুক্তিযুদ্ধকে রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তিমানুষের ভাঙন ও টিকে থাকার ইতিহাস হিসেবে দেখার একটি চমৎকার প্রয়াস।

সময় ফুরিয়ে এল। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার আলোচনা ও তর্ক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। ইচ্ছে করছিল আরও আলোচনা হোক। বইটি যেহেতু আগেই পড়া ছিল তাই আলোচনা করব এমন প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি শ্রেষ্ঠ আলোচকদের যে বইগুলো উপহার দেওয়া হবে সেগুলো আমার আগে থেকেই পড়া তাই আর আলোচনায় অংশ নিইনি। অবশেষে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার উদ্দেশ্যে অআকখ এর পাঠচক্রের চমৎকার এই আয়োজনের ইতি টানতে হলো।

লেখক ও সংবাদকর্মী।