মুমু: ভলোবাসা, আশ্রয় ও স্বাধীনতা হারানোর গল্প

গালিবা আনতারা সোয়ারা:
ছোট্ট একটা দারুণ উপন্যাস—‘মুমু’। রুশ লেখক ইভান তুর্গেনেভের (১৮১৮–১৮৮৩) লেখা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে বইটি। ‘মুমু’র গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরাসিম—একজন বোবা-কালা, শক্তিশালী ও সরল যুবক। তাকে গ্রাম থেকে এনে এক নিষ্ঠুর জমিদারনীর বাড়িতে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে সে তাতিয়ানা নামের এক মেয়েকে ভালোবাসে। কিন্তু জমিদারনীর ইচ্ছায় তাতিয়ানাকে অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।
তাতিয়ানা চলে যাওয়ার পর গেরাসিম একটি অসহায় কুকুরছানাকে উদ্ধার করে। তার নাম দেয় ‘মুমু’। মুমুই হয়ে ওঠে গেরাসিমের একমাত্র আপনজন। কিন্তু জমিদারনী মুমুকে পছন্দ না করায় তাকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়। বাধ্য হয়ে গেরাসিম নিজ হাতেই মুমুকে নদীতে ডুবিয়ে দেয়।এরপর গেরাসিম সব ছেড়ে নিজের গ্রামে ফিরে যায়। আগের মতো কাজ করলেও তার জীবনে আর হাসি বা আনন্দ ফিরে আসে না। মুমুকে হারানোর সঙ্গে যেন তার জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে যায়।
লেখকের মা-বাবা ছিলেন জমিদার। তাঁর মায়ের বয়স ছিল বাবার চেয়ে ১০ বছর বেশি। কথিত আছে, তাঁর বাবা শুধু সম্পত্তির জন্যই বিয়ে করেছিলেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হওয়ায় লেখক ছোটবেলা থেকেই জমিদারি ব্যবস্থার নানা অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতা নিজের চোখে দেখেছেন।
‘মুমু’ লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন রাশিয়ার জমিদারি ও দাসপ্রথার অমানবিকতা তুলে ধরা। গেরাসিমের মতো একজন শক্তিশালী মানুষও নিজের জীবন, ভালোবাসা ও প্রিয় প্রাণী—কোনোটার ব্যাপারেই নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একজন জমিদারনীর ইচ্ছাই তার জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।উপন্যাসটি পড়ে আমার দুটি বিষয় মনে হয়েছে। প্রথমত, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শোষণ ও নিপীড়নের চিত্র। দ্বিতীয়ত, মানুষ কিছু না কিছুকে আশ্রয় করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। সেই আশ্রয় হতে পারে কোনো মানুষ, একটি অবলা প্রাণী, কোনো আদর্শ কিংবা অন্য কিছু। কিন্তু সেই আশ্রয়টুকুও যদি তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে মানুষটা বেঁচে থেকেও যেন একটা জিন্দা লাশ হয়ে যায়।
‘মুমু’ আমাকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষ শুধু খাবার, কাজ আর বেঁচে থাকার জন্য বাঁচে না; তার প্রয়োজন ভালোবাসা, আশ্রয়, মর্যাদা ও স্বাধীনতা। এগুলো কেড়ে নিলে একজন মানুষ হয়তো বেঁচে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা আর বেঁচে থাকে না। তাই সব ধরনের শোষণ, নিপীড়ন ও দাসত্বের বাইরে মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেওয়াই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
শুভ্র/