গোলাপি ফিতায় বাঁধা বাড়ি

ইসরাত ইতু:
গত শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতোই ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু সেখানে পা রাখতেই চোখের সামনে যা দেখলাম, তাতে মুহূর্তেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! পরিচিত ঘরটির চেহারা রাতারাতি বদলে গেছে।
আসলে স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস ও গোলাপি ফিতা দিবস সামনে রেখেই এই আয়োজন।
চা-পাতার বয়ামে গোলাপি ফিতা প্যাঁচানো, ফ্রিজের হাতলে ঝুলছে গোলাপি রিবন, বাথরুমের আয়নাতেও একটা ছোট্ট গোলাপি ফিতা সাঁটা। এমনকি আমাদের বহু বছরের কাজের লোক সালাম ভাইয়ের মাথার গামছাটাও দেখি গোলাপি!
আমি তো অবাক। ফাতিহাকে ডেকে বললাম, “কী ব্যাপার? বাড়িতে বিয়ে নাকি? সবখানে গোলাপি ফিতা কেন?”
ফাতিহা তখন খুব গম্ভীর মুখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, “অক্টোবর মাস হলো স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস। আর গোলাপি রিবন হলো এর প্রতীক। চা-পাতার বয়ামে বেঁধেছি যেন দিনে তিনবার চা বানাতে গিয়ে আমাদের মনে পড়ে, নিজের শরীরের যত্ন নিতে হবে।”
ব্যস, ওই বিকেলেই ফাতিহা বাড়িতে এক জরুরি স্বাস্থ্য অধিবেশন ডেকে বসল। আশি বছরের দাদি থেকে শুরু করে ক্লাস সেভেনে পড়া মেয়ে টুসি পর্যন্ত সবাই হাজির হলো সেই অধিবেশনে।
ফাতিহা খুব সহজ করে বোঝাল, লজ্জা বা ভয় নয়। প্রতি মাসে নিজে নিজে পরীক্ষা করা এবং কোনো চাকা বা পরিবর্তন দেখলে সাথে সাথে ডাক্তারকে জানানো কতটা জরুরি। আর সবচেয়ে বড় কথা, শুরুতে ধরা পড়লে এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।
সবাই মন দিয়ে শুনছে। এমন সময় দাদি পান চিবোতে চিবোতে ফোকলা মুখে বলে উঠলেন, “বউমা, তোমার শ্বশুরমশাই যে তিন মাস ধরে পিঠের ব্যথাকে গ্যাসের ব্যথা বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, ওনাকেও একটা গোলাপি ফিতা বেঁধে দাও না! তাহলে অন্তত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা মনে থাকবে।”
দাদির কথা শুনে বাবা একেবারে কাঁচুমাচু। হাত কচলাতে কচলাতে বললেন, “আহা মা! ফিতা বাঁধতে হবে না, আমি কালই ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, কথা দিলাম!”
পুরো ঘর তখন হাসিতে ফেটে পড়ল। ফাতিহা মুচকি হেসে বলল, “দেখলেন বাবা, গোলাপি ফিতা শুধু মেয়েদের জন্য না। সচেতনতার বার্তাটা সবার জন্য।”
আসলেই তাই। সচেতনতার রঙ গোলাপি হতে পারে, কিন্তু তার আলোটা ছড়িয়ে পড়া উচিত আমাদের সবার মনে, লজ্জা আর ভয় ভুলে।