উম্মে সালমার ধারাবাহিক গল্প ফের দেখা – শেষ পর্ব

আমি শহরে চলে এলাম। আমাদের কিন্তু তখনো একে অপরের সাথে দেখা হয়নি। তবে আমি তো আগেই তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে দেখে নিয়েছিলাম। ক্লাস শুরু হলো। নিজেদের ক্লাস, নতুন ফ্রেন্ড সার্কেল সবকিছু নিয়ে আমাদের কথা হতো। এভাবেই দিন কাটছিল, কিন্তু তখনো আমার মনে ওর প্রতি বিশেষ কোনো অনুভূতি জন্ম নেয়নি। এদিকে আমি পড়াশোনা নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। হোস্টেলের জীবন, তার ওপর ক্লাস, কোচিং এসব নিয়ে দম ফেলার সময় পেতাম না। কিন্তু আমার এই ব্যস্ততা আয়ান মেনে নিতে পারছিল না। ওর ইচ্ছে হতো সারাদিন আমার সাথে কথা বলতে। আমি শুধু ক্লাসের ফাঁকে অবসর সময়ে ওর সাথে কথা বলতাম।
একদিন আয়ানের দুজন বন্ধু আমাকে কল দিয়ে জানাল, আয়ান একটি মেয়ের সাথে রিলেশনে আছে। এ কারণে সে নাকি বন্ধুদের সাথেও ঠিকমতো মেশে না। সারাদিন ওই মেয়ের সাথেই থাকে, এমনকি ক্লাস শেষ করেও তার সাথেই সময় কাটায়। এই কথা শুনে আমি তো খুশিতে আত্মহারা! ভাবলাম, এতদিন পর হলেও ছেলেটার অন্তত অন্য কোনো মেয়ের দিকে মন গেছে।
কিন্তু আয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই সে পুরো বিষয়টা অস্বীকার করল। ভাবলাম, হয়তো ওর বন্ধুরাই ভুল বলছে। কিছুদিন পর ওই বন্ধুরাই আবার আমাকে জানাল, সে একটি রিলেশনে থাকা সত্ত্বেও নতুন করে আরেকটি রিলেশনে জড়িয়েছে। আমি তাদের বললাম, আপনারা আর মিথ্যা বলবেন না। আমি তখনো তাদের কথা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আয়ানের হাবভাবের পরিবর্তন দেখে একদিন জোর করেই তাকে পুরো ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করলাম। শেষমেশ সে সব স্বীকার করল। জানাল, একটি মেয়ের সাথে তার এক বছর ধরে রিলেশন চলছে। এর মধ্যে কয়েকদিন আগে আরেকটা মেয়ে তাকে প্রপোজ করায় সে সেটাও গ্রহণ করেছে! অথচ সে নাকি আমাকেও ভালোবাসে! কথাটা শুনে আমার যেমন রাগ হচ্ছিল, তেমনি হাসিও পাচ্ছিল। একটা মন সে তিনজনকে দেওয়ার জায়গা করে রেখেছে!
তখন আমার সাবিতের কথা মনে পড়ে গেল। যেদিন সে আমাকে প্রপোজ করেছিল, সেদিন আমি তাকে বুঝিয়ে বলেছিলাম, দোস্ত, আমরা বন্ধু হিসেবেই ভালো আছি। আমাদের এই বন্ধুত্ব সারাজীবন থাকবে, কিন্তু প্রেমের সম্পর্ক আমার জন্য নয়। সে খুব সুন্দরভাবেই আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিল। সাবিতের সাথে আমার নিয়মিত কথা হতো না ঠিকই, তবে বাড়িতে গেলে কখনো দেখা হলে সালাম দিয়ে অন্তত কেমন আছিস, এতোটুকু কথা ঠিকই হতো। আর আয়ানকেও আমি বারবার বলেছিলাম যে তার সাথে আমার সম্পর্ক শুধুই বন্ধুত্বের। এর চেয়ে বেশি আমি কিছুই ভাবিনি, আর কখনো ভাববও না। কিন্তু সে যে স্বভাবের, তাতে তার সাথে বন্ধুত্ব রাখাটাও আমার জন্য ঠিক নয়। এমন একটা ছেলের সাথে আমি কখনোই বন্ধুত্ব রাখতে পারি না। এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র ৫ দিন আগে আমি তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কের ইতি টানলাম। কারণ এখানে পুরো দোষটাই ছিল তার। আমি তাকে সবসময় বলতাম, কাউকে যদি ভালোবাসিস তবে মন দিয়ে ভালোবাসবি, যাতে পরিণতি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু সে তো পুরোটাই অন্যরকম!
এরপর সে আমার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারল না, কারণ আমি আমার নম্বর পরিবর্তন করে ফেলেছিলাম। ওর সাথে আমার আর কোনোদিন কথা হবে না, এই পণই করেছিলাম। এরপর পরীক্ষা শুরু হলো, আমিও পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোযোগ দিলাম। দেখতে দেখতে মাসখানেক কেটে গেল, পরীক্ষাও শেষ হলো। অ্যাডমিশন টেস্টের জন্য কোচিংয়ে ভর্তি হলাম। পড়াশোনা, কোচিংয়ে যাতায়াত আর টিউশনি নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটতে লাগল। একদিন কোচিং থেকে বের হতেই হঠাৎ তাকে দেখলাম। প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম, পরে ভালো করে খেয়াল করে বুঝলাম আসলেই ওটা আয়ান। কিন্তু সে যেহেতু আমাকে সামনাসামনি কখনো দেখেনি, তাই চিনতেও পারল না। ওর এক বন্ধু আমাদের কোচিংয়েই পড়ত। সে হঠাৎ আমাকে ডাক দিয়ে বলল, সানভি, কাল তোমার নোটসগুলো নিয়ে আসবে? আমি পড়েই ফেরত দিয়ে দেব। আমার নামটা শুনতেই আয়ানের মনে খটকা লাগল, তার চেহারা দেখেই আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম। আমি ওই ছেলেকে আচ্ছা বলে সেখান থেকে সরে এলাম এবং গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
গাড়ি পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ পাশ থেকে কেউ একজন অশ্রুসিক্ত ভারী কণ্ঠে বলে উঠল, কেমন আছো সানভি? তুমি আমার সেই হৃদস্পর্শী? চিনতে পেরেছ আমায়?
আমি অন্যদিকে ঘুরে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম, খুব ভালো আছি। হ্যাঁ, আমি আপনাকে তখনই চিনতে পেরেছি। কিন্তু এখন আমি আপনাকে চিনি না, আর আপনিও আমাকে চেনেন না। এরপর থেকে কখনো কোনো মেয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে এভাবে নাম ধরে ডাকবেন না, আর কারো পিছুও নেবেন না।
এই কথা বলে আমি গাড়িতে উঠে পড়লাম। গাড়িটা পাশেই দাঁড় করানো ছিল বলে তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। চোখেমুখে এক তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছে। কিন্তু আজ আর তাতে আমার মন গলল না। আমি তাকে বন্ধু ভেবেছিলাম, আর সে আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল। যে ছেলে বন্ধুত্বের মর্যাদাই দিতে জানল না, সে ভালোবাসার মর্যাদা কী করে দিত? ভালোবাসার প্রতি এমনিতেই আমার কোনো বিশ্বাস ছিল না। এখন মনে হয়, কাউকে ভালোবাসতে নেই। যাকে ভালোবাসব, একদম হৃদয় দিয়েই ভালোবাসব, তবে সেটা বিয়ের পর।
পরের দিন সে কোচিংয়ের সামনে আবার এসে দাঁড়িয়েছিল, আমি কোনো কথা না বলে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিলাম। এরপর আরও দুএকবার এমন হয়েছে, কিন্তু আমি প্রতিবারই তাকে এড়িয়ে গেছি। তারপর থেকে তাকে আর সেখানে দেখা গেল না। আমার মনেও শান্তি ফিরে এলো। এভাবেই কয়েক বছর কেটে গেল। মাঝে মাঝে কোনো কাজে ওই এলাকায় গেলে তার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। শুরুর দিকে চোখাচোখি হলেও তার করুণ দৃষ্টি দেখে আমি আর তাকাই না। দ্রুত সেখান থেকে চলে আসি। তার জন্য আমার মনে আর কোনো অনুভূতিই কাজ করে না, তাকে আর মনেও পড়ে না। আজ হঠাৎ করেই আবার তার সাথে দেখা হয়েছিল।
পুরোনো সেই স্মৃতিগুলো হাতড়াতে হাতড়াতে দেখি ভোর ৪টা বেজে গেছে। খোলা চুলে বারান্দার চেয়ারে বসে এসবই ভাবছিলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এখন শুধু একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করছে:
“হৃদস্পর্শী বলে ডেকেছিলে যারে, যত্নে রাখতে পেরেছ কি হৃদয়ে তারে! ভালোবাসা কিংবা বন্ধুত্বে, দৃঢ় বিশ্বাস আর ভরসাই থাকে সবার আগে। কদর বুঝলে না তুমি নির্দিষ্ট সময়ে, কী হবে আর অশ্রুসিক্ত এই নয়নে! অপরাধবোধ অনুভব হবে সারাজীবন ধরে।”