উম্মে সালমার ধারাবাহিক গল্প ফের দেখা – তৃতীয় পর্ব

থমকে দাঁড়ালাম। মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এসব কী বলছে ও! আমরা শুধু বন্ধু, এর চেয়ে বেশি কিছু আমি তো ভাবতে পারব না। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে স্থির কণ্ঠে বললাম, আজ থেকে তোর সাথে আমার কোনো কথা নেই। কারণ তোকে আমি শুধুই বন্ধু ভেবেছি। আর কখনো কল দিবি না। ভালো থাকিস।
কথাগুলো বলেই কলটা কেটে দিলাম। ওকে আর কিছু বলার সুযোগই দিলাম না।
কিন্তু কল রাখার পর থেকে সে অনবরত ফোন করেই যাচ্ছে। আমি রিসিভ করছি না। নিজের তো মোবাইল নেই, আম্মুর মোবাইল। বারবার রিংটোনের আওয়াজ শুনে আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, কে কল দিচ্ছে? আমি এড়িয়ে গিয়ে বললাম, জানি না কে। আমার এমন এড়িয়ে যাওয়া দেখে আয়ান হয়তো ভাবছে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি, তাই হয়তো ওর প্রস্তাবটা মেনে নিইনি। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি অন্য কাউকেই ভালোবাসি না।
এভাবেই সময় কেটে যাচ্ছিল। শেষমেশ দুজনেই রাজি হলাম যে আমাদের বন্ধুত্বটা আগের মতোই থাকবে। তবে আমার মনে যদি কখনো তার প্রতি বিশেষ কোনো অনুভূতি জাগে, তবেই সম্পর্কটা সামনে এগোবে। আবার আগের মতোই স্বাভাবিক কথাবার্তা শুরু হলো।
এদিকে রেজাল্টের দিন ঘনিয়ে আসায় চিন্তায় আমার মাথা ভার হয়ে আসছিল। আজ দুপুর ১২টায় রেজাল্ট প্রকাশ হবে। টেনশনে সকাল থেকে কিছুই মুখে রুচছে না। ওদিকে আয়ান কল দিয়েই যাচ্ছে। আমি একটা কলও রিসিভ করিনি। কী ছেলে রে বাবা! নিজের রেজাল্ট নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, শুধু কল দিতেই ব্যস্ত।
দুপুর সোয়া ১২টায় খালাতো ভাইয়ের কল এলো। কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা রিসিভ করে বললাম, হ্যালো। ওপাশ থেকে ভাইয়া বলল, বোন তোর রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বরটা দে তো, রেজাল্টটা দেখি।
আমি ঠিক আছে বলে কলটা কেটে মেসেজে সব পাঠিয়ে দিলাম। এরপর নিজেও রেজাল্ট চেক করার জন্য মেসেজ অপশনে গিয়ে আস্তে আস্তে রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর টাইপ করে পাঠিয়ে দিলাম। ফিরতি মেসেজে রেজাল্ট আসতেই দেখলাম ৫.০০! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। উত্তেজনা আর নার্ভাসনেস দুটোই একসাথে কাজ করছিল। চুপচাপ উঠে দু রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিলাম। কিন্তু তখনও কাউকে কিছু বলিনি, মাকেও না।
ভাবলাম ভাইয়া কল দিলে মা এমনিতেই জানতে পারবেন। কিন্তু ভাইয়ার কলের আগেই দেখলাম স্যার কল দিয়েছেন। রিংটোনের আওয়াজ শুনে মা এসে কল রিসিভ করলেন।
মা বললেন, আসসালামু আলাইকুম স্যার।
স্যার বললেন, ওয়ালাইকুম আসসালাম আন্টি। মিষ্টি খাওয়ান আমাদের।
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রেজাল্ট পেলেন স্যার?
স্যার হাসিমুখে জানালেন, হ্যাঁ আন্টি। আলহামদুলিল্লাহ সানভি এ প্লাস পেয়েছে।
মায়ের চোখ পানিতে ভরে উঠল। অশ্রুসিক্ত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে মা বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! হ্যাঁ স্যার, অবশ্যই মিষ্টি খাওয়াব। আমি ওর বাবাকে একটু জানাই।
কলটা রাখার পরপরই ভাইয়ার কল এলো। ভাইয়াও রেজাল্টের খবর দিয়ে মায়ের কাছে মিষ্টির আবদার করল। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, তোর বাবার কষ্ট সার্থক হয়েছে মা।
এরপর মা রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন সবাইকে রেজাল্টের খবর জানাতে। ঠিক তখনই মোবাইলের স্ক্রিনে আয়ানের নম্বর ভেসে উঠল। রিসিভ করেই জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, তোর রেজাল্ট কী?
ও মন খারাপ করে বলল, ৪.৬৮ পেয়েছি রে। আমি অবশ্য এমনই আশা করেছিলাম, কারণ কয়েকটা পরীক্ষা তেমন ভালো হয়নি। তোর রেজাল্ট কী?
আমি বললাম, মন খারাপ করিস না। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এ প্লাস পেয়েছি।
আমার কথা শুনে আয়ান বলে উঠল, আলহামদুলিল্লাহ! আমার আর কোনো মন খারাপ নেই। তুই পেয়েছিস, তাতেই আমি ভীষণ খুশি।
আমার রেজাল্ট শুনে সে এতোটাই খুশি হয়েছিল যে, নিজের বাড়িতে মিষ্টি এনে সবাইকে খাইয়েছিল। বাড়ির সবাই নাকি তাকে বলছিল, তুই এ গ্রেড পেয়েই এতো খুশি, আর এ প্লাস পেলে তো পুরো গ্রামকে মিষ্টি খাওয়াবি!
কিছুক্ষণ পর বাবা কল দিলেন। রেজাল্ট শুনে তিনিও ভীষণ খুশি। আজ যেন আমাদের পুরো ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বিকেলে ভাইয়া কল দিয়ে মাকে বলল, আন্টি, ওকে আর গ্রামে পড়াবেন না, শহরে নিয়ে আসেন। আমি কলেজে ভর্তির আবেদনের সবকিছু করে দেব।
বিকেলে আয়ানের সাথে যখন কথা হচ্ছিল, তখন তাকে বিষয়টা জানালাম। বললাম, আমার কলেজে ভর্তির আবেদন শহরেই করা হবে। কথাটা শুনে তার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কারণ সে চাইলেও এখন শহরে গিয়ে পড়তে পারবে না। তাকে আরও দুই বছর পর, অর্থাৎ এইচএসসি পাস করে শহরে যেতে হবে। অথচ তার খুব ইচ্ছে ছিল আমরা দুজনে গ্রামের একই কলেজে ভর্তি হবো।
সে তার পরিবারকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে শহরে পড়তে চায়। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তার পরিবার তাকে শহরে পাঠাতে রাজি হলো না।
দেখতে দেখতে ভর্তির সময় পার হয়ে গেল। আমি শহরের একটা সরকারি কলেজে ভর্তি হলাম, আর সে গ্রামেরই একটি সরকারি কলেজে ভর্তি হলো।
(চলবে…)