উম্মে সালমার ধারাবাহিক গল্প ফের দেখা – দ্বিতীয় পর্ব

ফের দেখা (২য় পর্ব)
উম্মে সালমা
বাড়িতে ফিরতেই শুনি আম্মুর মোবাইলে টুংটাং শব্দ। হাতে নিয়ে মেসেজ চেক করতে গিয়ে রীতিমতো অবাক হলাম। অচেনা একটি নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে: “কেমন আছেন হৃদস্পর্শী? আমি আরাফ। আজ থেকে তোমার নাম দিলাম হৃদস্পর্শী। বাড়ি পৌঁছেছেন ম্যাম?”
মেসেজটা দেখেই আইরার ওপর ভীষণ রাগ হলো। বুঝতে বাকি রইল না যে কাজটা আইরাই করেছে। মনে মনে ওকে একচোট বকে ফ্রেশ হতে গেলাম। এরপর নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খেলাম। খুব ক্লান্ত লাগছিল, তাই কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। বিকেল চারটার দিকে উঠে আবার নামাজ পড়লাম। এরপর বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম। এমন সময় আম্মু ডাক দিয়ে বললেন, আইরা অন্য একটা নম্বর থেকে কল করেছে। আমি গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে সালাম দিলাম। ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ নেই। একটু পর একটা কণ্ঠ বেজে উঠল, “অবশেষে আমার হৃদস্পর্শীর গলা শুনলাম। তোমার কণ্ঠের প্রেমে পড়েছি আমি। নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলেছি!”
সামনে আম্মু দাঁড়িয়ে আছেন। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিছু বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে, ভালো থাকিস।” ওপাশ থেকে তখন সে জোরে জোরে হাসছে আর বলছে, “আম্মুর সামনে কিছু বলতে না পারা আমার ভীতু হৃদস্পর্শী!” আমি আর কথা না বাড়িয়ে কল কেটে দিয়ে মোবাইলটা রেখে চলে এলাম।
পরের দিন আইরাকে ইচ্ছেমতো বকাঝকা করলাম। বেচারি নিজের ভুলের জন্য বারবার সরি বলল। এভাবেই দেখতে দেখতে একটা মাস কেটে গেল। ছেলেটা দিন দিন বড্ড জ্বালাচ্ছে। সামনে আমার পরীক্ষা, ওরও পরীক্ষা। আমরা দুজনই এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাই ইদানীং কোচিং, ক্লাস আর নিজের পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকি। পড়ালেখা না করলে তো ডাহা ফেল। তাছাড়া এটি জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতসব ব্যস্ততার মাঝেও ওর সাথে আমার বন্ধুত্বটা বেশ জমে উঠেছে। শুধুই বন্ধুত্ব, অন্য কিছু নয়। অন্তত আমরা দুজনেই এই বিষয়ে পরিষ্কার ছিলাম। প্রতিদিন আমাদের কথা হয়, তবে তা মূলত পড়াশোনা নিয়েই। কার ক্লাসে আজ কী পড়ানো হলো, নিজে কী পড়লাম, এসব নিয়েই আড্ডা চলে। এভাবেই একটা নিয়মের মধ্যে আমাদের কথাবার্তা আর পড়াশোনা এগোতে থাকে।
অবশেষে পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। আমাদের তখনো সরাসরি দেখা হয়নি। শুধু কথার মাধ্যমেই বন্ধুত্বের ভিতটা টিকে আছে। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, ভাগ্যক্রমে আমাদের দুজনের পরীক্ষার কেন্দ্র পড়ল একই স্কুলে। প্রতিদিন কথা হতো বলেই বিষয়টা জানতে পারলাম। একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিলেও আমাদের একদিনও দেখা হলো না। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমার সিটের পাশে এবং সামনে যারা বসেছিল, তারা সবাই ওরই স্কুলের। কথার ছলে জানতে পারলাম, ওরা একসাথে ক্লাস আর কোচিং করত। ওরা খুব ভালো বন্ধু। আমি জেনেও আরাফকে এই বিষয়ে কিছু জানাইনি। তবে শেষমেশ বান্ধবীদের কাছ থেকেই সে সব জেনে যায়। ওর বান্ধবীরা নাকি গল্পচ্ছলে আমার কথা বলেছিল। আমি নাকি অনেক হেল্পফুল, সবার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করি এবং কেউ কিছু না পারলে সাহায্য করি। ওদের বর্ণনা শুনেই আরাফ বুঝতে পারে যে মেয়েটি আসলে আমি। সেদিন আমার ওপর ওর সে কী রাগ! বারবার জানতে চাইল, আমি কেন ওকে আগে বলিনি। ওর খুব ইচ্ছে হলো আমার সাথে দেখা করার, কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হলাম না।
পরের দিন ও দ্রুত পরীক্ষা শেষ করে আমাদের হলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। আমি অবশ্য এর কিছুই জানতাম না। পরীক্ষা শেষে সবার সাথে গল্প করতে করতে হল থেকে বের হলাম। আমরা তো কেউ কাউকে আগে দেখিনি। দেখলাম, আমার পাশের সিটের মেয়েটি একটা ছেলের সাথে কথা বলছে। নাম শুনেই বুঝতে পারলাম যে এই ছেলেটিই আরাফ। আমি আর সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে এলাম। ও নাকি আমাকে অনেকক্ষণ খুঁজেছে। ওর বান্ধবীদেরও আকারে ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু তারা কিছু বলতে পারেনি। বাসায় ফিরে দেখি ওর কল আসছে। মাত্র বাসায় ফিরেছি বলে কল রিসিভ করিনি। ফ্রেশ হয়ে একটা ঘুম দিলাম। বিকেলে আবার কল এলে রিসিভ করলাম। কথায় কথায় ওকে জানালাম যে আমি ওকে দেখতে পেয়েছি। সে তো রেগে আগুন! কেন আমি গিয়ে কথা বলিনি, তাই নিয়ে অনেক অভিমান। সে নাকি আমার সাথে দেখা করবে বলে ত্রিশ মিনিট আগে পরীক্ষা শেষ করে বেরিয়ে এসেছিল এবং অনেকক্ষণ অপেক্ষাও করেছিল। আমি বললাম, সেখানে দুজন দাঁড়িয়ে থাকায় আমি একটু কনফিউজড ছিলাম। আমাকে দেখতে না পেয়ে বেচারার খুব আফসোস হলো। পরের দিন দেখা করার কথা বললে আমি সরাসরি না করে দিলাম। বললাম, এখন পরীক্ষা চলছে, তাই দেখা করা সম্ভব নয়। এখন বরং মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষাটা শেষ করা ভালো।
এভাবেই আমাদের বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ হলো। শেষ পরীক্ষার দিন বন্ধুরা সবাই মিলে একটু আড্ডা আর নাস্তা করতে গিয়ে বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে গেল। বাসায় এসে দেখি মোবাইলে ওর অনেকগুলো মেসেজ। রিপ্লাই দিতেই ও কল করল। কল করতে দেরি হলো কেন জানতে চাইলে আমি সব বুঝিয়ে বললাম। তারপর উচ্ছ্বাসের সাথে বললাম, “অবশেষে আমাদের পরীক্ষা শেষ! আজ আমি খুব খুশি।” কিন্তু ওর কথার ধরন আজ একটু অন্যরকম লাগছিল। যে ছেলেটা সবসময় ‘তুই’ করে কথা বলে, সে আজ হঠাৎ ‘তুমি’ করে বলছে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে, আজ তুই হঠাৎ তুমি তুমি করে কথা বলছিস কেন?”
আরাফ একটু থেমে বলল, “আসলে তোমাকে আমি একটা কথা বলতে চাই। কথাটা বলার আগেই, তুমি সামনে না থাকা সত্ত্বেও আমার হাত পা কাঁপছে। কিন্তু আজ বলতে না পারলে হয়তো আর কখনোই বলতে পারব না। আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে, খুব ভয় লাগছে।”
আমি চিন্তিত হয়ে বললাম, “কেন, কী হয়েছে? তুই কি অসুস্থ?”
“না। সানভি…”
“হ্যাঁ, বল।”
“সানভি, আই… আই লাভ ইউ সানভি! প্লিজ, তুই রাজি হয়ে যা। আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না। আমি তোকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি। এই মুহূর্তে তুই ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারছি না, এমনকি নিজেকেও না। প্লিজ তুই ‘না’ করিস না। তুই ‘না’ বললে আমি শেষ হয়ে যাব।”
কথাগুলো ও এক নিঃশ্বাসে বলে গেল, আর বুঝতে পারলাম ওপাশ থেকে সে হাউমাউ করে কাঁদছে।
(চলবে…)