স্মৃতিকথায় জুলাইয়ে ফেনী

উম্মে হাবিবা
২০২৪ সালের জুলাই মাস। ফেনীর আকাশে তখন আন্দোলনের উত্তাপ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ট্রাংক রোড, ইসলামপুর রোড, মিজান রোড এবং রেলগেট এলাকায়। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নামত। তাদের চোখে ছিল স্বপ্ন, কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের ভাষা।
আমি আজও ভুলতে পারিনি শহীদ মিনারের সেই দিনগুলোর কথা। ছাত্রীরা ছিল আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে। একদিন তাদের শহীদ মিনারে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, যাতে তারা আন্দোলনে অংশ নিতে না পারে। কিন্তু কোনো ভয় তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারা সেখান থেকেই প্রতিবাদের কণ্ঠ আরও জোরালো করে বেরিয়ে এসে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল।
আন্দোলন যতই বিস্তৃত হচ্ছিল, উত্তেজনাও ততই বাড়ছিল। অবশেষে এল সেই ৪ আগস্ট। সকাল থেকেই হাজার হাজার ছাত্র-জনতা মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকে। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল শুধু একটি ন্যায্য দাবির প্রত্যয়। দুপুরে সবাই একসঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে যখন মোনাজাতে হাত উঠেছে, ঠিক তখনই নেমে আসে বিভীষিকা। চারদিক থেকে শুরু হয় নির্বিচারে গুলিবর্ষণ।
মুহূর্তেই মহিপাল পরিণত হয় এক রক্তাক্ত জনপদে। মানুষের চিৎকার, আহতদের আর্তনাদ আর গুলির শব্দে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। সেদিনের এই নির্মম হামলায় বহু তাজা প্রাণ ঝরে যায়। ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, সরোয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহম্মদ শিহাব, ছাইদুল ইসলাম শাহীসহ আরও অনেক ছাত্র-জনতা শহীদ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেন। সব মিলিয়ে এগারো জন শহীদের আত্মত্যাগে রঞ্জিত হয় ফেনীর মাটি।
এখনও যখন মহিপাল অতিক্রম করি, তখন মনে হয় এই পথের প্রতিটি ধূলিকণায় শহীদদের রক্তের স্মৃতি মিশে আছে। শহীদ মিনারের প্রতিটি ইট যেন সেই সাহসী ছাত্র-ছাত্রীদের গল্প বলে, যারা অন্যায়ের সামনে সেদিন মাথা নত করেনি। রেলগেট থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ফেনীর ইতিহাসে সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক অমর অধ্যায় হয়ে আছে।
জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলো শুধু স্মৃতি নয়; সেগুলো আমাদের চেতনা, আমাদের প্রেরণা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল শিক্ষা।
লেখক: শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ।