সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

বাংলা সাহিত্যে ঈদ: শতবর্ষের বিবর্তন ও নজরুলের অবদান

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

মো. রবিন ইসলাম

খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটে। মুসলমানরা যখন এদেশে আসেন, তখন এই অঞ্চল বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। মুসলমানগণ ইরান, তুরস্ক এবং আরব দেশ থেকে এদেশে গমন করেন। তবে যেখান থেকেই আসুন না কেন বা এদেশেই উদ্ভূত হোন না কেন, মধ্যযুগেই মুসলমানরা পুরোপুরি বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন এবং তাদের মাতৃভাষা হয়ে উঠেছিল বাংলা। সে সময় বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান যৌথভাবে পাশাপাশি বাস করতেন। তারা সাহিত্য চর্চায়ও লিপ্ত ছিলেন।

তবে শাহ মুহম্মদ সগীর থেকে শুরু করে খোন্দকার শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকী বা মীর মশাররফ হোসেনের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত মধ্যযুগের মুসলিম রচিত সাহিত্যে রোমান্স, কল্পকথা, ইসলামি পুরাণ, লোকপুরাণ, ইসলামের ইতিহাস এবং আরবি, ফারসি ও হিন্দি কাব্যগ্রন্থের তর্জমা বা ভাবানুসরণই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। লোকাচার, জীবনাচার, ধর্মাচার অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানদের প্রাত্যহিক জীবন সেখানে খুব একটা প্রশ্রয় পায়নি। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আধুনিককাল পর্যন্ত, যখন কেবল আর স্বভাব কবিতা লেখা হচ্ছে না, বরং চিন্তার চর্চাও শুরু হয়েছে।

ঈদ মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর দুটি ঈদের আগমন ঘটে বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ নিয়ে। ঈদ ধর্মীয় উৎসব তো বটেই, তবে আজ তা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য কবি ও সাহিত্যিক ঈদকে ঘিরে রচনা করেছেন অসংখ্য গান, কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প।

ঈদের কবিতার সূচনা

সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৮০ – ১৯৫৬) কবিতাগ্রন্থ ‘ডালি’-এর দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৬৬) ‘ঈদ’ নামে দুটি কবিতা পাওয়া যায়। প্রথমটির প্রথম ছত্র ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ এবং দ্বিতীয়টির প্রথম ছত্র ‘বিশ্ব জুড়ে মুসলিমের গৃহে গৃহে আজি’। ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ পঙ্‌ক্তি সংবলিত ‘ঈদ’ কবিতাটির নিচে কবির একটি টীকা আমাদের জন্য খুব মূল্যবান: “১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বর্ষ নবনূরের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত। ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।” প্রথম এই ঈদের কবিতার প্রথম দুটি স্তবক নিচে তুলে ধরা হলো:

কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।

আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়া যেন কয়ে যায়
‘মুসলিম জাহান আজি একতায়
দেখ কত বল ধরে?’

১৯০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯০৩, ১৯০৪ এবং ১৯০৫, পরপর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। অন্তত এই অর্থে যে, প্রত্যেক বছরই এই পত্রিকায় ঈদ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ‘নবনূর’ পত্রিকার প্রধান সাহিত্যিক আবিষ্কার ও ফসল ছিলেন সৈয়দ এমদাদ আলী নিজে, কায়কোবাদ এবং বেগম রোকেয়া। এই তিনজন লেখকই ‘নবনূরে’ ঈদ সংক্রান্ত কবিতা বা গদ্য লিখেছেন। ‘নবনূর’ পত্রিকার পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কায়কোবাদ লেখেন ‘ঈদ’ শীর্ষক কবিতা। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত ফাল্গুন ১৩১১ সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘ঈদজ্জোহা’ নামক প্রবন্ধ। পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় একই সঙ্গে ঈদ সম্পর্কিত তিনটি লেখা প্রকাশিত হয়: সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা, জীবেন্দু কুমার দত্তের ‘ঈদ সম্মিলন’ কবিতা এবং বেগম রোকেয়ার ‘ঈদ সম্মিলন’ গদ্যপ্রবন্ধ।

পরবর্তীতে ‘ঈদ আবাহন’ নামে কায়কোবাদ দুটি কবিতা লিখেছিলেন। একটি তাঁর ‘অশ্রুমালা’ (১৩১১) গ্রন্থে এবং অন্যটি তাঁর ‘অমিয়ধারা’ (১৩২৯) গ্রন্থে স্থান পায়। পাশাপাশি মোজাম্মেল হক এবং শেখ ফজলল করিমও ‘ঈদ’ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। নজরুলের অব্যবহিত দুই পূর্বসূরি শাহাদাৎ হোসেন ও গোলাম মোস্তফাও ঈদ বিষয়ক কবিতা লিখেছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম: ঈদ সাহিত্যের রূপকার

কাজী নজরুল ইসলাম অবিসংবাদিতভাবে বাংলা সাহিত্যে আরবি ও ফারসি শব্দ তথা মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে তাঁর নানামুখী উদ্যমের মধ্যে ইসলামি আচার ও ব্যবহারিক দিকগুলোও রয়েছে। ঈদ তার মধ্যে অন্যতম। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা, এই দুই ঈদ নিয়েই নজরুল কবিতা, গান, নাটক ও গীতিবিচিত্রা লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু রচনার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • কবিতা: কৃষকের ঈদ, ঈদ মোবারক, জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ, ঈদের চাঁদ, সর্বহারা, বকরীদ, কোরবানি, শহীদী ঈদ এবং খুশির ঈদ।

মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ ও মোজাম্মেল হক, উনিশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ তিন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রতিভাবান লেখকের উত্তরাধিকার বহন করেছেন নজরুল এবং একা তিনি একে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বহুদূর। ঈদ নিয়ে এতকাল যে ধারায় কবিতা বা গান লেখা হয়েছে, নজরুল তাকে অনায়াসে অতিক্রম করেছেন। ঈদ সম্পৃক্ত তাঁর কবিতা, গান ও নাটকে তাঁর নিজস্বতার ছাপ স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, বাঙালি মুসলমানকে তা নতুনভাবে উজ্জীবিত করেছে এবং আজও করে চলেছে।

১৯২০ সালেই নজরুল লেখেন ঈদুল আজহা নিয়ে অসাধারণ কবিতা ‘কোরবানি’। মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুল একের পর এক ইসলামি ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতা লিখে যাচ্ছিলেন। নজরুলের ঈদ সংক্রান্ত কবিতা ও গানে তাঁর সাম্যবাদী চেতনার জোরালো প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। একদিকে আছে নিছক আনন্দ ও উল্লাস (যেমন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’), অন্যদিকে আছে সাম্যের আহ্বান (‘দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত’) বা নবজাগরণের বাণী।

নজরুলের ঈদুল ফিতরের কবিতায় বারবার এসেছে দরিদ্রের জন্যে তাঁর মমত্ববোধ। সাধারণভাবেই নজরুল চেয়েছিলেন বাঙালির জাগরণ। তেমনি ঈদের সম্পূর্ণতম গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। তিরিশের দশকে রচিত এই গান যুগ যুগ ধরে বাঙালি মুসলমানকে কথায়, সুরে ও ছন্দে মাতিয়েছে। আনন্দময়তা, সাম্যবোধ ও আত্মার জাগরণ, নজরুলের এই ত্রিমাত্রিকতা এক অপরূপ মাত্রা পেয়েছে এই কালজয়ী গানের ভেতরে:

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ।।
তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ।।
তুই পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।।
আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশমন হাত মিলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব-নিখিল ইসলামে মুরিদ।।

পরবর্তী ধারা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

নজরুল ইসলামের পরবর্তীকালে ঈদের কবিতা ও গান লিখেছেন সিকানদার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, তালিম হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, মনোমোহন বর্মণ প্রমুখ অনেক কবি। ফররুখ আহমদ তাঁর ‘ঈদের স্বপ্ন’ সনেটে ঈদের চাঁদ দেখে তাঁর স্বপ্নজগতেই প্রস্থান করেন। শামসুর রাহমান তাঁর একটি কবিতায় শৈশবের ঈদের আনন্দের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। শহীদ কাদরীর কবিতায় ‘সুনীল ঈদগা’ দেখা দেয় প্রতীকের মতো। এমনিভাবে ঈদের আনন্দ ও বেদনা মূর্ত হয়েছে সৈয়দ এমদাদ আলী থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের রচনায়।

১৯২০ সালে দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয় ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাহিত্যে প্রাণচঞ্চলতা সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছিলেন। আমাদের ধর্মীয় ও অন্যান্য উপাচারগুলো সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে মিশে যেতে কয়েকশ বছর লেগে গেলো। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের দুই ঈদ তথা ধর্মীয় উৎসবগুলোকে অসাধারণ সৌন্দর্য ও তাৎপর্যে মণ্ডিত করে এক যুগান্তর সৃষ্টি করেছিলেন। দেশ বিভাগের পরে ঢাকা যখন বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য অনেক কিছুর মতো ঈদ উদযাপনে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও জোরালো হয়ে ওঠে। রেডিও ও টেলিভিশনে ঈদ উদযাপন আনন্দের সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মিলিয়ে দেয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদ সংখ্যার প্রকাশ তাকে আরও গতি দেয়।

গত শতবর্ষ ধরে ঈদের কবিতা, গান ও কথাসাহিত্য আমাদের ধর্মীয় আনন্দের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আনন্দকে একটু একটু করে মিশিয়ে তুলেছে। শতাব্দীর সূচনায় যার সূত্রপাত হয়েছিলো, বর্তমান সময়ে এসে আমরা তার পরিণত রূপ দেখতে পাচ্ছি। ঈদ আজ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এক অবারিত সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের গৃহ ও সাহিত্যকে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তুলেছে।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা