প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এবার আন্তর্জাতিক বিজনেস হাব হতে চায় শ্রীলঙ্কা

সোনালি সৈকত, ঐতিহাসিক নগরী আর দিগন্তজোড়া চা বাগানের জন্য বিশ্বজুড়ে সুখ্যাতি রয়েছে শ্রীলঙ্কার। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই পরিচিতির গণ্ডি পেরিয়ে দেশটি এবার নিজেদের রূপান্তর করতে চায় আন্তর্জাতিক বিজনেস হাব হিসেবে।
এই রূপান্তরের অগ্রভাগে রয়েছেন শ্রীলঙ্কা কনভেনশন ব্যুরোর চেয়ারম্যান ধীরা হেত্তিয়ারাচ্চি। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন আয়োজন এবং করপোরেট সমাবেশের জন্য এই দ্বীপরাষ্ট্রকে শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত করতে একটি বড় উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সম্প্রতি কলম্বোয় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এসএল মাইস এক্সপো ২০২৬। পাঁচ দিনের এই আয়োজনে বিশ্বের ২৭টি দেশ থেকে অংশ নিয়েছেন ১২০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধি। স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী, ইভেন্ট পরিকল্পনাকারী ও ভ্রমণ পরিচালকদের জন্য এই প্রদর্শনী বিশ্ববাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার এবং ভবিষ্যৎ চুক্তি নিশ্চিত করার এক বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
ধীরা হেত্তিয়ারাচ্চি এই প্রদর্শনীকে প্রচলিত পর্যটন মেলার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, শ্রীলঙ্কা যে কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দেশ নয়, বরং এখানে বিশ্বমানের করপোরেট আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করার পূর্ণ পেশাদার সক্ষমতা রয়েছে, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেটিই বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ
শ্রীলঙ্কা কনভেনশন ব্যুরো বিজনেস ট্যুরিজম বা বাণিজ্যিক পর্যটনকে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রদর্শনীতে ওয়ান অন ওয়ান বৈঠক, নেটওয়ার্কিং সেশন এবং বিভিন্ন সফরের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় সেবা প্রদানকারীদের সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রাথমিক করমর্দনগুলোকে চূড়ান্ত বাণিজ্যিক চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপান্তর করা।
এই উদ্যোগকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে শ্রীলঙ্কা সরকারও। দেশটির পর্যটন উপমন্ত্রী অধ্যাপক রুয়ান রানাসিংহে প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন যে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হতে পারে বিজনেস ট্রাভেল। সরকারি নীতি ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শ্রীলঙ্কাকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই এখন মূল লক্ষ্য।
এক ভিন্ন ধারার পর্যটক
করপোরেট বা করপোরেট পর্যটকদের আকৃষ্ট করা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য দারুণ সুফল বয়ে আনে। সাধারণ ভ্রমণকারীদের তুলনায় এই শ্রেণির পর্যটকদের মাধ্যমে হোটেল, পরিবহন ও রেস্তোরাঁ খাতে তুলনামূলক বেশি ও নির্ভরযোগ্য রাজস্ব আয় হয়। এ ছাড়া সম্মেলন শেষে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে দেশটির দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন।
এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক আয়তন একটি বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে কলম্বোয় একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক বৈঠক শেষ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, উপকূলীয় রিসোর্ট কিংবা পাহাড়ি চা বাগানে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। কাজ এবং অবসরের এমন চমৎকার মেলবন্ধন খুব কম দেশেই দেখা যায়। দেশ পুনর্গঠন ও উচ্চমূল্যের পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে এই খাতটি শ্রীলঙ্কার সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
যোগাযোগ থেকে রাজস্বের হাতছানি
এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বিদেশি ক্রেতাদের সরাসরি উপস্থিত হওয়া। ২৭টি দেশের ক্রেতাদের কলম্বোয় নিয়ে আসার ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সহজে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পেরেছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ইতিবাচক প্রচার বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে শ্রীলঙ্কা পুরোপুরি প্রস্তুত।
কনভেনশন ব্যুরোর চেয়ারম্যানের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি সুনাম প্রতিষ্ঠা করা। আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান, পেশাদারিত্ব এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমেই এটি টেকসই রূপ পাবে। আজকের একটি সফল আন্তর্জাতিক সম্মেলন আগামী দিনের কর্মসংস্থান, পুনরাবৃত্তি ভ্রমণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার পর্যটন শিল্পের জন্য এই উদ্যোগ এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।