বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলন সামনে রেখে জলবায়ু বিতর্কে আলোচনার কেন্দ্রে এআই

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি পরিচালনায় ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোর ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণ নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে জলবায়ুবিষয়ক বিতর্কে এআই এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

আগামী মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। সম্মেলনের আয়োজকদের বরাতে প্যারিস থেকে এএফপি জানিয়েছে, আয়োজকরা ‘জলবায়ু-সচেতন এআই’ ব্যবহারের বিষয়টি এগিয়ে নিতে চান।

তবে প্রযুক্তিটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এবং এটি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআইয়ের সম্ভাব্য ভূমিকা অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত করা, শিল্পকারখানার নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কাজের অনেক ক্ষেত্রেই ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি কিংবা অ্যানথ্রপিকের ক্লডের মতো সাধারণ কাজে ব্যবহারের উপযোগী ভাষাভিত্তিক মডেলের তুলনায় কম শক্তি প্রয়োজন হয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) এআই বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ সিং এএফপিকে বলেন, ‘ডেটা সেন্টার এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এআইয়ের এসব কার্যক্রম জ্বালানি ব্যবস্থা, জ্বালানি খাত ও জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে প্রকৃত উদ্বেগ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে এআই যেহেতু একটি হাতিয়ার, তাই এটি একটি সুযোগও তৈরি করছে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে প্রযুক্তিটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দক্ষতা বাড়াতে এআই

জটিল জ্বালানি ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ গ্রিডের কার্যকারিতা বাড়াতে ইতোমধ্যে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রিড পরিচালকেরা সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ওঠানামা আরও ভালোভাবে সামাল দিতে পারছেন।

এআইয়ের সাহায্যে নির্দিষ্ট এলাকার মেঘের আচ্ছাদন, সূর্যালোক ও বাতাসের পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা আরও নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

সিদ্ধার্থ সিং বলেন, গ্রিডের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন করা সম্ভব হলেও যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায় না, তা কমাতেও এআই সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেওয়াকে ‘কার্টেইলমেন্ট’ বলা হয়।

আইইএর হিসাব অনুযায়ী, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও ভবনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এআই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ এক্সাজুল জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।

জ্বালানির এ পরিমাণ ইন্দোনেশিয়ার এক বছরের মোট চাহিদার সমান।

সিং বলেন, উদাহরণ হিসেবে সৌরবিদ্যুতের প্রাচুর্য থাকা সময়ে ওয়াশিং মেশিন চালানোর সময় নির্ধারণে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়াটটাইম কোম্পানিগুলোকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, মুঠোফোন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এমন সময়ে চালানোর ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে, যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহৃত হয়।

ওয়াটটাইমের সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্যাভিন ম্যাককরমিক বলেন, ‘এআই যে কাজগুলো খুব ভালোভাবে করতে পারে, তার একটি হলো পূর্বাভাস দেওয়া।’

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বিপ্লব

ইউরোপীয় মাঝারি-মেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের (ইসিএমডব্লিউএফ) মহাপরিচালক ফ্লোরিয়ান পাপেনবার্গার বলেন, দ্রুত ও উচ্চমানের পূর্বাভাস তৈরির মাধ্যমে এআই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এআই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সত্যিকার অর্থেই বিপ্লব ঘটিয়েছে। এখন অনেক দ্রুত, উচ্চ দক্ষতা ও নির্ভুলতার সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’

তিনি বলেন, এআইভিত্তিক পূর্বাভাস এখনো পদার্থবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মডেলের ওপর নির্ভরশীল। তবে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইসিএমডব্লিউএফ এমন কাজ মাত্র দুই বছরে করতে পারছে, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে করতে ১০ বছর সময় লাগত।

প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এআইভিত্তিক পূর্বাভাস তৈরির খরচও অনেক কম। ফলে কেন্দ্রটি এখন আরও বেশি পূর্বাভাস তৈরি করতে পারছে।

প্রযুক্তিটি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নেও সহায়তা করতে পারে।

মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলের তথ্য অনুযায়ী, তাদের একটি ব্যবস্থা ১৫০টিরও বেশি দেশে নদীর বন্যার পূর্বাভাস সাত দিন আগে পর্যন্ত দিতে পারে।

পাপেনবার্গার বলেন, এআই মানুষের বিকল্প হয়ে ওঠার পরিবর্তে মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, এআই আমাদের একধরনের অতিমানবীয় সক্ষমতা দিচ্ছে, যাতে আমরা আগের চেয়ে আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারি।’

নিঃসরণ শনাক্ত করতে স্যাটেলাইট ও এআই

তেল-গ্যাস স্থাপনা, খনি ও বর্জ্য ফেলার স্থানসহ নির্দিষ্ট স্থাপনা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ শনাক্ত করতেও স্যাটেলাইট ও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।

ম্যাককরমিকের সহপ্রতিষ্ঠিত উদ্যোগ ‘ক্লাইমেট ট্রেস’ এ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং দূষণকারী পদার্থের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করছে।

ম্যাককরমিক বলেন, ‘এআইয়ের কারণে ক্লাইমেট ট্রেস ২০ বছর এগিয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন প্রতিটি শহরের জন্য নিঃসরণের তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পেরেছি। অনেক শহর ইতোমধ্যে এসব তথ্য ব্যবহার করে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে পারছে। এআই ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।’

তেলশিল্পেও এআইয়ের ব্যবহার

তবে এআই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দক্ষতা ও ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করলেও তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ, ভূগর্ভস্থ তেলের ও গ্যাসের মজুত শনাক্ত এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন আরও কার্যকর করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ এআই’-এর নির্বাহী পরিচালক মারিয়া জোয়াও সুজা বলেন, ‘এই দিক থেকেও এআই জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এআই কখনোই সব সমস্যার একক সমাধান হতে পারে না। প্রযুক্তি একা কখনোই সমাধান নয়।’